বগুড়া শহরের রেলওয়ে মার্কেট এলাকায় ঢুকলেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ টিনশেড ওয়ার্কশপ, যেখানে হালকা প্রকৌশল যন্ত্রপাতি তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। প্রতিটি ওয়ার্কশপে গড়ে তিন থেকে চারজন শ্রমিক ব্যস্ত রয়েছেন যন্ত্র তৈরিতে। এখানেই তৈরি হচ্ছে দেশের কৃষিতে ব্যবহৃত অধিকাংশ যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ, যা দেশের কৃষিযন্ত্রের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করছে। পাশাপাশি এসব ওয়ার্কশপ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জন্য। দেশের চাহিদা মিটিয়ে সীমিত পরিসরে এসব যন্ত্র বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
বগুড়ায় এ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৬৫ সালে, অবাঙালি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। সে সময় তৈরি হতো মূলত হস্তচালিত যন্ত্রাংশ। এরপর আশির দশকে বাঙালি উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে এই শিল্প নতুন গতি পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্প ছড়িয়ে পড়ে শহর ও শহরতলির গোহাইল রোড, ছিলিমপুর, বিশ্বরোড, চারমাথা, ফুলবাড়ী, কলোনি এলাকা, বিসিক শিল্পনগরী, বনানী ও চেলোপাড়া এলাকায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন ফাউন্ডেশন (এসএমই ফাউন্ডেশন) এই শিল্পকে ঘিরে ‘ক্লাস্টার’ বা গুচ্ছ শিল্প এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ক্লাস্টারে গড়ে উঠেছে তিন ধরনের উদ্যোক্তা-ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক এবং ফাউন্ড্রি শিল্প।
এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ক্লাস্টারটির আওতায় বর্তমানে প্রায় ৭০০টি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ৫০০টি কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন কেন্দ্র এবং ৭৫টি ফাউন্ড্রি রয়েছে। এসব কারখানার সমন্বয়ে বগুড়া হয়ে উঠেছে দেশের যন্ত্রপাতি আমদানির বিকল্প একটি শক্তিশালী ঘাঁটি। এ শিল্প থেকে বার্ষিক টার্নওভার হচ্ছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
উদ্যোক্তাদের অনেকেই স্বল্প মূলধনে ব্যবসা শুরু করে এখন কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বগুড়ার বাঘোপাড়া এলাকায় অবস্থিত এপি মেটাল ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম জানান, তিনি ২০১৮ সালে মাত্র ৭ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় ১২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। দেশের ৫৫টি জেলায় তার পণ্যের সরবরাহ রয়েছে বলে জানান তিনি। এ শিল্পকে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সরকার যদি ঋণের সুদহার কিছুটা কমায় তবে বিনিয়োগ আরও বাড়বে এবং শিল্পটি আরও প্রসারিত হবে।”
তবে এত সম্ভাবনার পরও কিছু চ্যালেঞ্জ থেকে গেছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ক্লাস্টারের আওতাধীন কারখানাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার কারণে উৎপাদনে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। তারা এসব কারখানাকে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
বগুড়া লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ফাউন্ডেশনের সভাপতি গোলাম আযম বলেন, “আমাদের এখানে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় কৃষি যন্ত্রপাতি। তবে এটি আরও এগিয়ে নিতে আমাদের প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অঞ্চল যেখানে আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্র তৈরি সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে, রপ্তানি বাড়বে এবং দেশীয় ভোক্তারাও কম দামে উন্নতমানের পণ্য পাবে।”
এই শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে পিতল, কাস্ট আয়রন, পিগ আয়রন, অ্যালুমিনিয়াম, এমএস প্লেট, কার্বন সেল, সিলিকন, ম্যাঙ্গানিজ, হার্ড কোক ও ফার্নেস অয়েল। আর যন্ত্র তৈরির জন্য ব্যবহৃত মেশিনগুলোর মধ্যে রয়েছে লেদ মেশিন, মিলিং মেশিন, শেপিং মেশিন, প্লেনার মেশিন, সেপার, টুলস গ্রাইন্ডার, হুনিং মেশিন ও ক্রানশফ। এখানে উৎপাদিত প্রধান যন্ত্রপাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ধান মাড়াই কল, কাঠ চিড়াই মিল, তেল কল, মুড়ির মিল, সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প, টিউবওয়েল, ফেব্রিকেটেড পণ্য, পাওয়ার টিলারের যন্ত্রাংশ, ফিড মেশিন, লাইনার, পিস্টন, গজন পিন, ফাল বুশ, ৬২/৪-এর শেফ এবং ডিজেল ইঞ্জিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।
এসএমই ফাউন্ডেশন ২০১৫ সাল থেকে এই ক্লাস্টারে উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, মেল্টিং ও মোল্ডিং প্রযুক্তি, হিট ও সারফেস ট্রিটমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালিয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ৯ কোটি টাকার ঋণ সুবিধাও প্রদান করেছে।
তবে কর্মপরিবেশ এখনো অনেক জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন মুশফিকুর রহমান বলেন, “এখানকার কর্মীরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ অবস্থায় শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষকে সচেতন করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সরকারেরও এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।”
সার্বিকভাবে বলা যায়, বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প শুধু দেশের কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে না এটি একটি শক্তিশালী গ্রামীণ শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দৃষ্টান্ত হিসেবেও উঠে আসছে। যথাযথ পরিকল্পনা, বিনিয়োগ সহায়তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে এই খাত বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের তালিকায় আরও বড় জায়গা করে নিতে পারে।

