যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও তাদের মিত্ররা ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধ ও ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া দখলের পর রাশিয়ার ওপর ২৫ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। লক্ষ্য ছিল ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের রুশ অর্থনীতি দুর্বল করা। সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা গেছে ২০২২ সালে রুশ ব্যাংকগুলোকে সুইফট পেমেন্ট সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর।
চীনা ব্যাংকগুলোও ওয়াশিংটনের সতর্কবার্তার কারণে রাশিয়াকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ব্যবসায়ীরা ফিরিয়ে এনেছে পুরনো পদ্ধতি—বার্টার ট্রেড বা পণ্য বিনিময়। সোভিয়েত পরবর্তী ১৯৯০-এর দশকের পর এটি প্রথমবারের মতো রাশিয়ার বৈদেশিক বাণিজ্যে দেখা যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রুশ ব্যবসায়ীরা গমের বিনিময়ে চীনা গাড়ি পাচ্ছে, তিসি বীজের বিনিময়ে নির্মাণসামগ্রী আদান–প্রদান করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার বাণিজ্য কাঠামো বদলে দিয়েছে। চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত হলেও বার্টারের পুনরুত্থান দেখায়, পশ্চিমা চাপ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার ব্যবসা আবার পুরনো, সরাসরি বিনিময়ের দিকে ফিরে এসেছে।
তবে পুতিন দাবি করছেন, রাশিয়ার অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করছে। তিনি বলেন, গত দুই বছরে জি-৭ দেশগুলির তুলনায় রাশিয়ার অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার জন্য যথাসাধ্য নির্দেশ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি প্রযুক্তিগত মন্দা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতির এই দ্বন্দ্বপূর্ণ চিত্র দেখাচ্ছে, একদিকে রাশিয়ার অর্থনীতি আংশিকভাবে শক্তিশালী হলেও অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও বাজারের জন্য চাপ কমেনি।
২০২২ সালে রুশ ব্যাংকগুলোকে সুইফট পেমেন্ট সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন করার পর সবচেয়ে কঠিন আঘাত পায় রাশিয়ার অর্থনীতি। চীনা ব্যাংকগুলোও ওয়াশিংটনের হুঁশিয়ারির কারণে রাশিয়াকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে পুনরায় বেড়ে এসেছে পণ্য বিনিময় বা বার্টার বাণিজ্য। ২০২৪ সালে রাশিয়ার অর্থনীতি মন্ত্রণালয় ‘বিদেশী বার্টার লেনদেনের গাইড’ নামে ১৪ পাতার একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে, কীভাবে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা যায়।
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, অন্তত আটটি নতুন বার্টার চুক্তি হয়েছে। এ তথ্য মিলেছে বাণিজ্য উৎস, কাস্টমস পরিষেবা ও কোম্পানির বিবৃতি থেকে। দুটি বাণিজ্যিক সূত্র জানায়, এক লেনদেনে চীনা গাড়ির বিনিময়ে রাশিয়ার গম বিক্রি হয়েছে। চীনা অংশীদাররা ইউয়ান দিয়ে গাড়ি কিনেছেন, রুশ ব্যবসায়ীরা রুবলে গম কিনেছেন। পরে সেই গমের বিনিময়ে গাড়ি আদান-প্রদান হয়েছে। তবে কত পরিমাণ পণ্য বেচাকেনা হয়েছে বা মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া কী ছিল— তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
আরো দুটি লেনদেনে তিসি বীজ বিনিময় করা হয়েছে গৃহস্থালি পণ্য ও নির্মাণ সামগ্রীর সঙ্গে, যা চীন থেকে আনা হয়েছে। উরালস অঞ্চলের শুল্ক দপ্তরের ২০২৪ সালের নথি অনুযায়ী, ফ্ল্যাক্স সংক্রান্ত একটি চুক্তির মূল্য প্রায় এক লাখ ডলার। চীন তিসি বীজের বড় আমদানিকারক দেশ, যা শিল্প ও খাদ্যে ব্যবহার হয়। অন্যান্য লেনদেনে দেখা গেছে, চীনে ধাতু পাঠানো হয়েছে মেশিন বিনিময়ে, কাঁচামালের বিনিময়ে চীনা সেবা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি লেনদেন পাকিস্তানের সঙ্গেও হয়েছে। কিছু লেনদেন রাশিয়ায় পশ্চিমা পণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি করেছে, তবে পণ্যের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গত আগস্টে কাজান এক্সপো ব্যবসায়িক ফোরামে চীনা কোম্পানিগুলো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে অর্থপ্রদানের জটিলতার কথা উল্লেখ করেছে। হাইনান লংপান অয়েলফিল্ড টেকনোলজি কো. লিমিটেডের চেয়ারম্যান শু সিনজিং বলেন, বর্তমান সীমিত অর্থপ্রদানের পরিস্থিতিতে বার্টার ট্রেড রাশিয়া ও এশিয়ার উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার বাণিজ্যকে নতুন পথে ঠেলে দিয়েছে। নগদ আর্থিক লেনদেনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বার্টার ট্রেড এখন ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে।
সোভিয়েত পতনের পর ১৯৯০-এর দশকে পণ্য বিনিময় অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। আজ রাশিয়ায় টাকা থাকা সত্ত্বেও পণ্য বিনিময় চালু হয়েছে মূলত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কারণে। কিছু ব্যবসায়ী ‘পেমেন্ট এজেন্ট’ বা তৃতীয় পক্ষ ব্যবহার করছে, কেউ কেউ ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছে। রাশিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘বিসিএস’–এর কর্মকর্তা সের্গেই পুতিয়াতিনস্কি বলেন, ছোট ব্যবসাগুলো একসঙ্গে ১০–১৫ ধরনের পরিশোধ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এটি দেখায়, অর্থনীতি টিকে থাকার চেষ্টা করছে। পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে রাশিয়া আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন ছাড়াই পণ্য ও সেবা আদান–প্রদান করতে পারছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যে দেশটির বাণিজ্যকে স্থিতিশীল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
রাশিয়ার এই বার্টার উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, দেশের বাণিজ্যকে নিষেধাজ্ঞার চাপে টিকে থাকার নতুন পথও দেখাচ্ছে। নগদ লেনদেনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বাধীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এটি স্পষ্ট করে, শক্তিশালী বৈদেশিক চাপের মধ্যেও দেশের ব্যবসায়ীরা উদ্ভাবনী পথে বাণিজ্য চালানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

