অর্থনীতির দুটি পা হলো ব্যাংক ও পুঁজিবাজার কিন্তু স্বাধীনতার পর ৫৪ বছর ধরে অর্থায়নে শুধু ব্যাংকনির্ভর হয়ে আছে বাংলাদেশ। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মূল ভরসা বন্ড ও পুঁজিবাজার হলেও বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি সব অর্থায়ন করছে ব্যাংক। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। অবিলম্বে শক্তিশালী বন্ড ও পুঁজিবাজার গড়ে তোলা জরুরি।
গতকাল সোমবার রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের বন্ড ও সুকুক বাজারের উন্নয়ন: রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো বাস্তবায়ন ও ইসলামী মানি মার্কেটের বিকাশ’ শীর্ষক সেমিনারে এ আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক। সভাপতিত্ব করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব অরলিন্সের অধ্যাপক এম কবির হাসান।
ড. সালেহউদ্দিন বলেন, বিশ্বের আর কোনো দেশে বিনিয়োগ বাংলাদেশের মতো ব্যাংকনির্ভর নয়। ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের বাইরে চিন্তাই করেন না। এর পেছনে রাজনৈতিক কারণ বা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতাও থাকতে পারে। তিনি বলেন, সময় এসেছে বদলানোর। ব্যবসায়ীদের বন্ড ও সুকুক বাজারে আনতে হবে এবং এ বাজারে আস্থা তৈরি করতে হবে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বেক্সিমকো সুকুকের টাকা কোথায় বিনিয়োগ হয়েছে, তা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেন, প্রকল্প অর্থায়নে সরকারের ঘাটতি আছে। ব্যবসায়ীরা কর কমাতে চান, কিন্তু দিতে চান না। কর কমালে সরকারের পক্ষে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া কঠিন হবে। করদাতাদের অনীহার কারণ, তারা সেবা পান না। তাই সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ঋণভিত্তিক সরকারি প্রকল্পের বাইরে নতুন চিন্তা দরকার। মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্পের সম্পদকে আর্থিক সিকিউরিটিতে রূপান্তর করে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের অর্থ জোগাড় করা সম্ভব। সরকার চাইলে পেনশন ফান্ড ও বীমা খাতকে ব্যবহার করে বন্ডের চাহিদা তৈরি করতে পারে।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির সবচেয়ে বড় উৎস বন্ড বাজার, যার আকার ১৩০ ট্রিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে পুঁজিবাজার, আকার ৯০ ট্রিলিয়ন ডলার। ব্যাংক খাত আছে তৃতীয় স্থানে, আকার ৬০ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। তিনি বলেন, করপোরেট বন্ড বাজার নেই বললেই চলে, আছে শুধু সরকারি বন্ড। সঞ্চয়পত্রকে সিকিউরিটিতে রূপান্তর করে সেকেন্ডারি বাজার তৈরি করা গেলে দ্রুতই বন্ড বাজার গড়ে তোলা সম্ভব।
সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, টেকসই অর্থায়নের জন্য কার্যকর বন্ড বাজারের বিকল্প নেই। বিএসইসির চেয়ারম্যান খোন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, অর্থনীতির দুটি পা হলো ব্যাংক ও পুঁজিবাজার। শুধু এক পায়ে ভর দিয়ে অর্থনীতি এগোতে পারে না। সেমিনারে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বন্ড অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও অযথা জটিলতার অভিযোগ করেন। রেনাটার সিএফও মুস্তফা আলীম আওলাদ বলেন, বিএসইসির শর্ত ও ডিএসইর তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়া এত জটিল যে ২০ কার্টন কাগজ জমা দিতে হয়েছে।
সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, বেক্সিমকোর সুকুক নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে। আসল টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কিনা তা নিশ্চিত নয়, তবে না পারলেও শেয়ার বিক্রি করে অর্থ ফেরত আনা সম্ভব। তার মতে, ঋণের চেয়ে বন্ড বা সুকুক কম ঝুঁকির বিনিয়োগ। আইএফসির কর্মকর্তা তাহসিনা মোহসিন বলেন, বন্ডে তৃতীয় পক্ষের গ্যারান্টি যুক্ত করা হলে আস্থা বাড়বে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী বলেন, নতুন বাজারে শুরুতে কিছু সমস্যা থাকবেই, তা মেনে নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ইশতেকমাল হোসেন জানান, বন্ড বাজার গড়তে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একসঙ্গে কাজ করছে। এরই মধ্যে একটি প্রতিবেদন সরকারকে দেওয়া হয়েছে। সবাইকে সরকারি সুকুক কিনতে আহ্বান জানান তিনি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক অধ্যাপক এম কবির হাসান বলেন, বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা ৬০ হলেও অর্থনীতি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হলে বন্ড ও সুকুকের বিকল্প নেই।

