মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় নারীর সংখ্যা এখনও নগণ্য। ফোর্বসের সর্বশেষ হিসাবে, ৪০০ জন ধনীর মধ্যে আছেন মাত্র ৬২ জন নারী। যা মোট তালিকার মাত্র ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৭ জন বা প্রায় ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৯ সালের পর এবারই প্রথম, তালিকায় নারীর সংখ্যা বাড়েনি। এতে স্পষ্ট হয়েছে নারী–পুরুষের ব্যবধান সম্পদের দিক থেকেও প্রবল।
ফোর্বস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই অতিধনী ৬২ নারীর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭২ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৭ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এক বছর আগে এই সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮৩৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৮৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ধনী নারীদের মধ্যে কারা শীর্ষে রয়েছেন, তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ফোর্বস।
১. অ্যালিস ওয়ালটন

মার্কিন ধনীদের তালিকায় শীর্ষে আছেন অ্যালিস ওয়ালটন। ওয়ালমার্ট সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী এই নারী ব্যবসায়ী দীর্ঘ এক দশকে ৯ বার শীর্ষ ধনী নারীর আসন দখল করেছেন। তাঁর বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০৬ বিলিয়ন ডলার বা ১০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। ফোর্বসের হিসাবে, অ্যালিস ওয়ালটন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫তম ধনী ব্যক্তি এবং দেশের প্রথম নারী ‘সেন্টিবিলিয়নিয়ার’। অর্থাৎ তাঁর সম্পদের অঙ্ক পেরিয়েছে ১২ শূন্যের ঘর। বয়স ৭৫ বছর হলেও তিনি এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নারী উদ্যোক্তা। গত বছর তিনি ফ্রান্সের প্রসাধনী কোম্পানি লরিয়েলের উত্তরাধিকারী ফ্রাঁসোয়াজ বেটেনকোর্ট মেয়ার্সকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী নারী হিসেবে জায়গা করে নেন।
২. জুলিয়া কচ:

যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী নারী হলেন জুলিয়া কচ। তাঁর সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৮১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। বয়স ৬৩ বছর। জুলিয়া কচের সম্পদের প্রধান উৎস কচ ইনকরপোরেটেড। স্বামী ডেভিড কচের মৃত্যুর পর তিনি কোম্পানিটির ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা উত্তরাধিকার সূত্রে পান। এ সম্পদ তাঁকে মার্কিন ধনীদের তালিকায় শীর্ষে নিয়ে এসেছে। চলতি সেপ্টেম্বরেই জুলিয়া কচ ও তাঁর সন্তানরা নতুন বিনিয়োগের পথে এগিয়েছেন। তারা এনএফএল দলের নিউইয়র্ক জায়ান্টসের একটি শেয়ার কেনার জন্য চুক্তি সম্পন্ন করেছেন।
৩. জ্যাকুলিন মার্স:

যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় শীর্ষ ধনী নারী হলেন জ্যাকুলিন মার্স। তাঁর সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। বয়স ৮৫ বছর। জ্যাকুলিন মার্স বিশ্বের শীর্ষ কনফেকশনারি ও পোষা প্রাণীর খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মার্স ইনকরপোরেটেডের উত্তরাধিকারী। এমঅ্যান্ডএমস, স্নিকার্স, পেডিগ্রি—এ ধরনের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড এই কোম্পানির মালিকানাধীন। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ফ্র্যাঙ্ক সি মার্সের নাতনি জ্যাকুলিন বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের এক-তৃতীয়াংশ শেয়ারের মালিক। এ কারণে তিনি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বেও অন্যতম ধনী নারী হিসেবে পরিচিত।
৪. মিরিয়াম অ্যাডেলসন:

যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ শীর্ষ ধনী নারী হলেন মিরিয়াম অ্যাডেলসন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। বয়স ৭৯ বছর। মিরিয়াম অ্যাডেলসন লাস ভেগাস স্যান্ডস করপোরেশনের প্রধান শেয়ারধারী। প্রয়াত স্বামী শেলডন অ্যাডেলসনের ব্যবসায়িক উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি ক্যাসিনো ও রিসোর্ট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ পান। তিনি শুধু ব্যবসায়ী নন, একজন চিকিৎসক ও দাতব্যকর্মী হিসেবেও পরিচিত। বিশেষ করে মাদকাসক্তি চিকিৎসা গবেষণায় সহায়তার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত।
৫. অ্যাবিগেল জনসন:

যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম শীর্ষ ধনী নারী হলেন অ্যাবিগেইল জনসন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। বয়স ৬৩ বছর। অ্যাবিগেইল জনসন ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। পরিবারের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শেয়ারের পাশাপাশি দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি কোম্পানিটিকে আরও শক্তিশালী করেছেন। বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক পরিষেবায় তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে ফিডেলিটি ইনভেস্টমেন্টস আজ বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
৬. ম্যাকেঞ্জি স্কট:

যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ শীর্ষ ধনী নারী হলেন ম্যাকেঞ্জি স্কট। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। বয়স ৫৫ বছর। ম্যাকেঞ্জি স্কট অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর বিপুল সম্পদের মালিক হন। তবে তিনি কেবল ধনী হিসেবেই নয়, দাতব্যকর্মী হিসেবেও পরিচিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি ইতিমধ্যে কোটি কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন। মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তাঁর এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
৭. ম্যারিলিন সিমন্স:

যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম শীর্ষ ধনী নারী হলেন ম্যারিলিন সিমন্স। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। বয়স ৭৪ বছর। ম্যারিলিন সিমন্স স্বামী জেরি সিমন্সের সঙ্গে এসজেএল সিমন্স করপোরেশনের মালিক। তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা মূলত হেজ ফান্ড বিনিয়োগ ও বিনোদন খাতে বিস্তৃত। ব্যবসার পাশাপাশি ম্যারিলিন সিমন্স দাতব্য কার্যক্রম ও শিক্ষাক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তাঁর উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসিত।
৮. এলেইন মার্শাল:

যুক্তরাষ্ট্রের এই অষ্টম শীর্ষ নারী ও তাঁর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের ধনী ব্যবসায়ী। তিনি পিঞ্চার গ্রুপের উত্তরাধিকারী। পরিবারের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। শিক্ষাক্ষেত্র ও দাতব্য কাজে তাঁর অবদান সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সে জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
৯. মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস:

যুক্তরাষ্ট্রের নবম শীর্ষ ধনী নারী হলেন মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। বয়স ৬১ বছর। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি বিশাল সম্পদের মালিক হন। তবে তাঁর পরিচিতি শুধু ধনী নারী হিসেবে নয়, দাতব্যকর্মী হিসেবেও বিশ্বজোড়া। মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক উন্নয়নে কোটি কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্বীকৃত।
১০. লিন্ডাল স্টিফেন্স গ্রেথ:

যুক্তরাষ্ট্রের দশম শীর্ষ ধনী নারী হলেন অটাম ওয়াল্টন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। বয়স ৫০ বছর। অটাম ওয়াল্টন ও তাঁর পরিবার তেল ও গ্যাস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি ২০১৩ সালে বাবার প্রতিষ্ঠিত এন্ডেভার এনার্জি রিসোর্সেসের পর্ষদে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। এন্ডেভার এনার্জি রিসোর্সেস যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় বেসরকারি তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বাবার উত্তরাধিকার সামলিয়ে এখন তিনিই কোম্পানির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

