মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি আংশিকভাবে বন্ধ থাকার প্রভাবে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে, এই সংকটের কারণে গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে জ্বালানির দামে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটি ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যে উচ্চতা দেখা গিয়েছিল, তার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে সামগ্রিক পণ্যের দাম প্রায় ১৬ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যার পেছনে মূল ভূমিকা রাখছে জ্বালানি, সার এবং ধাতুর মূল্যবৃদ্ধি।
সংকটের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। কিন্তু সংঘাতের কারণে এখানে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দৈনিক প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বছরের শুরু থেকে এর দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ৮৬ ডলার হতে পারে, যা ২০২৫ সালে ছিল ৬৯ ডলার। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই দাম ১১৫ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।
জ্বালানির পাশাপাশি সারের বাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারের দাম প্রায় ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং ইউরিয়ার দাম প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। সংস্থাটি জানিয়েছে, যদি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিশ্বজুড়ে আরও প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে পড়তে পারে।
ধাতব বাজারেও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের মতো ধাতুর দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর দাম প্রায় ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ম্যাক্রো অর্থনীতিতেও এর প্রভাব স্পষ্ট হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫.১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা ইন্দর্মিত গিল বলেন, যুদ্ধের প্রভাব ধাপে ধাপে ছড়িয়ে পড়ে—প্রথমে জ্বালানির দাম বাড়ে, এরপর খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলে। বর্তমান পরিস্থিতিও সেই দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

