বছর শেষের দুই দিন আগেই, ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কনটেইনার পরিবহন ছাড়িয়েছে ৩৪ লাখ টিইইউ (টোয়েন্টি ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট)। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। বছরের ভিত্তিতে এই সংখ্যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দেশের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশই প্রধান এ সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে সম্পন্ন হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দর দিয়ে ৩৪ লাখ ২ হাজার ৭৬২ টিইইউ কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে। এর আগে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০২৪ সালে, যখন ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউ কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি, কমলাপুর কনটেইনার ডিপো ও পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল এই হিসাব দিয়েছে। এতে আমদানি-রফতানি পণ্যবাহী এবং খালি কনটেইনারও অন্তর্ভুক্ত।
মোট কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে মোট খোলা পণ্য পরিবহন হয়েছে ১৩ কোটি ৭৮ লাখ টন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৩৯ লাখ টন। এতে সব ধরনের পণ্য পরিবহনে ১১ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি দেখা গেছে। কনটেইনার ছাড়া সাধারণ পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল, সিমেন্ট, সিরামিকস, সার, পাথর, ভোগ্যপণ্য, জ্বালানি তেল ইত্যাদি। এসব পণ্য জেটি ছাড়া বহির্নোঙরেও খালাস হয়। পণ্য পরিবহনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, “বছরশেষের একদিন আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং ছাড়িয়েছে ৩৪ লাখ টিইইউ। এটি ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এতে আরো প্রায় ৮ হাজার টিইইউ যোগ হবে। বড় অর্জন হলো জাহাজের গড় অবস্থান সময় একেবারে শূন্যে নেমেছে। আমদানি-রফতানিতে ব্যবসায়ীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে আমরা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, “কনটেইনার জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম, ওয়েটিং টাইম ও ডুয়াল টাইম উন্নয়নের কারণে সাগরে জাহাজের অবস্থান সময় কমে এসেছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।”
তবে পণ্য হ্যান্ডলিং বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের শেষ তিন-চার মাসে কার্যক্রমে ধারাবাহিক কমতি হয়েছে। আগস্টে বন্দর দিয়ে মোট ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫২৩ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল। এরপর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরে হ্যান্ডলিং যথাক্রমে ৩ লাখ ১২ হাজার ২৭০, ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯২ ও ২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৮ টিইইউতে নেমে আসে।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেন, বছরের শেষের দিকে আমদানি-রফতানি কমায় বহির্নোঙরে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময়ও কমেছে। অনেক জাহাজ জেটিতে পৌঁছার পরপর ভিড়ার সুযোগ পাচ্ছে। রফতানিতে যুক্ত ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ধীর গতির কারণে পশ্চিমা দেশগুলোতে বড়দিন উৎসবের সময়ও রফতানিতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও দেশে শিল্পপণ্যের বিক্রি কমায় কাঁচামাল আমদানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বন্দর হিসাব অনুযায়ী, আগস্ট থেকে রফতানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে কমছে। আগস্টে পণ্যের হ্যান্ডলিং ছিল ৮৮ হাজার ৪০৮ টিইইউ, সেপ্টেম্বর ৭১ হাজার ২৩৪ টিইইউ, অক্টোবর ৭১ হাজার ১১৭ টিইইউ।
কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমান বলেন, “বছরভিত্তিক পণ্যের হ্যান্ডলিং বেড়েছে, তবে শেষ কয়েক মাসে রফতানি কমেছে। বিদেশী ক্রেতারা বন্দরের ট্যারিফ ইস্যুতে অর্ডার ডিলে করছেন। এছাড়া এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আছে। বন্দরের জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম কমার তথ্য ভালো খবর, তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি খেয়াল রাখতে হবে।”
আমদানিতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে পণ্যভর্তি কনটেইনার হ্যান্ডলিং ছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৯৮৩ টিইইউ, তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর তা যথাক্রমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৯২ ও ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৬ টিইইউতে নেমে আসে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদিত পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়া, ঝুঁকি এড়াতে ব্যবসায়ীদের সতর্কতা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এলসি সমস্যা মূল তিনটি কারণে আমদানি কমেছে। ক্রাউন সিমেন্টের ভাইস চেয়ারম্যান ও জিপিএইচ ইস্পাতের চেয়ারম্যান মো. আলমগীর কবির বণিক বলেন, “গত বছরের তুলনায় ইস্পাত ও সিমেন্ট বিক্রি ১৮ শতাংশ কমেছে। ব্যবসায়ী ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। ব্যাংক থেকে এলসি খোলায় সীমাবদ্ধতা আছে। অনেক বিদেশী ব্যাংক সরাসরি অ্যাকসেপ্টেন্স দিচ্ছে না। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি কমছে।”

