২০২৫ সালে অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতির ছবি দেখা গেলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফেরেনি। কাগজে-কলমে অগ্রগতি থাকলেও সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মনে চাপ ছিল বছরজুড়েই।
বছরের শুরুটা হয়েছিল তুলনামূলক ভালো অবস্থানে। বছর শেষে এসে দেশের বাহ্যিক খাত কিছুটা স্বস্তি পায়। রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা এবং ডলারের মজুত বাড়ার ফলে অর্থনীতির এই অংশে চাপ কমে। ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতি অনেকটাই ঠেকানো এবং ডলার সংকট কমানো অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সাফল্য বলে মনে করেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তবে ভালো খবরের পাশাপাশি হতাশার দিকও ছিল। সামগ্রিক সূচকে উন্নতি হলেও পুরো বছরজুড়ে ব্যবসা ও বাণিজ্য পরিবেশ ছিল মলিন।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে চাপে রাখে। হাতেমের মতে, গত আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের বড় ব্যর্থতার জায়গা ছিল আইনশৃঙ্খলার অবনতি।
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ২০২৫ সালে রেমিট্যান্স হয়ে ওঠে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি। অনেকে মনে করেন, বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে নতুন করে দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগ্রত হওয়ায় রেমিট্যান্স বেড়েছে। পাশাপাশি হুন্ডি ও হাওলার মতো অবৈধ চ্যানেল কমে আসাও বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন রেকর্ড ৩০ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই অঙ্ক ছিল ২৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। মাসভিত্তিক হিসাবে মার্চে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে। ওই মাসে আয় দাঁড়ায় ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে। এতে ব্যাংকিং খাতে তারল্য বেড়ে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপ কমে।
মে মাসে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করলেও সারা বছর ডলার বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। শক্তিশালী রেমিট্যান্স, আমদানি ব্যয় কমে আসা এবং রপ্তানি আয় এই পরিবর্তনকে সহজ করেছে। আইএমএফের ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণ করতেও এই ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, নতুন ব্যবস্থায় টাকার মান আরও কমবে। তবে সে আশঙ্কা বাস্তব হয়নি। বছরের বেশির ভাগ সময় ডলারের দাম ছিল প্রায় ১২২ টাকার কাছাকাছি। বড় ওঠানামা হলে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করেছে।
এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি না করে আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনতে শুরু করে। চলতি অর্থবছরে ডলার কেনা ছাড়িয়েছে ৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানির জন্য রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করা হয়। চলতি অর্থবছর থেকে রিজার্ভ পুনর্গঠনে জোর দেওয়া হচ্ছে।
২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম৬) পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে একই সময়ে মোট রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
বৈদেশিক লেনদেনের অবস্থাও উন্নত হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর সময়ে পরিশোধ ভারসাম্যে ১ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা যায়। আগের বছর একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি। সেপ্টেম্বর শেষে দেশের বৈদেশিক ঋণ দাঁড়ায় ১১২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারে, যা জুন শেষে ছিল ১১৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
বাহ্যিক খাতে স্বস্তি এলেও দেশের ভেতরে ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল স্থবির। গত আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তোলে। অনেক প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগ পিছিয়ে দেয়।
উচ্চ সুদের হার পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। নীতিগত সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকায় ঋণের সুদ উঠে যায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে। এতে ঋণ নিতে আগ্রহ হারায় ব্যবসায়ীরা। হাতেম জানান, ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলতে দেরি করায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সময়মতো উৎপাদন চালাতে পারেনি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহেও ছিল অনিয়ম।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি কমে দাঁড়ায় ৬২৭ মিলিয়ন ডলারে। কমেছে ১০ শতাংশ। মধ্যবর্তী পণ্যের এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১৯ শতাংশ। অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় দুর্বল আইনশৃঙ্খলা সরবরাহ ব্যবস্থা ও খুচরা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে।
ঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় মালিকেরা গ্রেপ্তার হওয়ায় বেক্সিমকো, এস আলম ও নাসা গ্রুপের বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়া ও গাজীপুরে প্রায় ১০০ পোশাক কারখানাও বন্ধ ছিল।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আগের সরকারের সময় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ব্যাংক লুট করেছে। এখন তার মাশুল দিচ্ছে ভালো ব্যবসাগুলো।
সারা বছর মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ শতাংশের আশপাশে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা দুর্বল ছিল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা। তবুও ব্যবসায়ীদের আশা, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন হলে আস্থা ফিরবে এবং নীতিগত স্পষ্টতা আসবে।

