বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা ভারত থেকে আমদানি করতে খরচ হয় গড়ে ২.৫৫ ডলার। একই সুতা স্থানীয় মিল মালিকরা ২.৮০ ডলারের নিচে বিক্রি করতে পারেন না। স্থানীয় মিল মালিকদের দাবি, এই দরে বিক্রি করলেও তাদের লোকসান হচ্ছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিদেশি ক্রেতারা এই বাড়তি দাম গ্রহণ করবে না। তবে মিল মালিকরা এই তুলনাটিকে অন্যায় মনে করছেন।
টেক্সটাইল মিল ও গার্মেন্ট (পোশাক) রপ্তানিকারকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্ব দেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে ফাটল সৃষ্টি করেছে। নীতিনির্ধারকদের জন্য বিষয়টি অবহেলা বা ভুলভাবে পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। সংকটের মূল কারণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি। এতে বলা হয়েছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় সুতা আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশ দেওয়া হোক। মন্ত্রণালয় মনে করছে, শুল্কমুক্ত আমদানির কারণে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। দেশীয় উৎপাদনকারীদের সুরক্ষায় এই সুবিধা স্থগিত করা উচিত। গত ১২ জানুয়ারির সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর এখনও কোনো পদক্ষেপ নেনি। তবে দুই খাতের প্রতিক্রিয়া ছিল ত্বরিত এবং সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।
পোশাক রপ্তানিকারকরা এই প্রস্তাবকে ‘আত্মঘাতী’ আখ্যায়িত করেছেন। তারা সতর্ক করেছেন, সস্তায় সুতা আমদানির সুবিধা বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে টেক্সটাইল মিল মালিকরা এই পদক্ষেপকে তাদের জন্য ‘লাইফলাইন’ হিসেবে দেখছেন এবং অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) আরও এক ধাপ এগিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার হস্তক্ষেপ না করলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা দেশের সব মিল বন্ধ রাখবে।
এটি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী খাতের সংঘাত নয়। বরং দুই শিল্প একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল এবং যৌথভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির মেরুদণ্ড গড়ে তুলেছে। গত অর্থবছরে শ্রমঘন পোশাক খাত প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এটি দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে পোশাক কারখানাগুলোতে সুতা ও কাপড় সরবরাহ করে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে গড়ে ওঠা পুঁজিঘন টেক্সটাইল খাত। দুটি খাতেই লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। উভয় খাতই ব্যাংকঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং বিশ্ববাজারের যেকোনো বড় ধাক্কায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাণিজ্য ও শুল্ক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, ব্যবসায়িক আস্থা যখন নড়বড়ে এবং বিনিয়োগকারীরা ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির স্বচ্ছতার জন্য অপেক্ষা করছেন, তখন এমন বৈরী অবস্থান বৃহত্তর অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে। তারা বলেন, এক পক্ষের ক্ষতি করে অন্য পক্ষকে সহায়তা করলে পুরো ভ্যালু চেইন আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
যেভাবে সুতা সংকটের অচলাবস্থা তৈরি হলো:
একসময় বাংলাদেশ সুতা ও ফ্যাব্রিকের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। তবে গত তিন দশকে বড় বিনিয়োগের কারণে শক্তিশালী ‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ তৈরি হয়েছে। এখন স্থানীয় উৎপাদনকারীরাই নিটওয়্যারের প্রায় পুরো চাহিদা এবং ওভেন পোশাকের প্রায় অর্ধেক চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
কিন্তু গত দুই-তিন বছরে এই সাফল্য চাপের মুখে পড়েছে। আমদানিকৃত সুতা—মূলত ভারত থেকে—সস্তা হওয়ায় পোশাক রপ্তানিকারকরা ক্রমশ আমদানি করার দিকে ঝুঁকেছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের পরবর্তী দুই বছরে সুতা আমদানি দ্বিগুণ হয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছে ভারত।
এর ফলে স্থানীয় মিলগুলোর ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পোশাক অর্ডার কমে যাওয়ায় স্পিনিং মিলগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি মজুত জমেছে। উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক ক্ষমতাও অলস পড়ে আছে। এই মন্দার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উইভিং, ডাইং ও প্রিন্টিং খাতেও। প্রায় ২ হাজার টেক্সটাইল ইউনিটের কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।
মিল মালিকদের কয়েক মাসের অনুরোধের পর সরকার বন্ড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আনার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসতেই রপ্তানিকারকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এরপরই বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) মিল বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এতে দুই খাত প্রকাশ্যে বিরোধের দিকে চলে গেছে।
বিটিএমএর দাবি, শুল্কমুক্ত আমদানি অব্যাহত রাখা স্থানীয় মিলগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকি। অন্যদিকে পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন—বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ—বলছে, বন্ড সুবিধা বাতিল করলে উৎপাদন ব্যয় ৮-১০ শতাংশ বেড়ে যাবে। ফলে রপ্তানিকারকদের বছরে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাড়তি খরচ হবে।
শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলে সুতা আমদানিতে রপ্তানিকারকদের বাড়তি শুল্ক গুনতে হবে প্রায় ৩৭ শতাংশ। তখন তারা আমদানি করে সস্তায় পোষাতে পারবে না। বিকল্প হলো স্থানীয় মিলগুলো থেকে সুতা কেনা, যার জন্য প্রতি কেজিতে বাড়তি ০.৪০–০.৬০ ডলার খরচ করতে হবে।
বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা ভারত থেকে আমদানি করতে খরচ হয় গড়ে ২.৫৫ ডলার। একই সুতা স্থানীয় মিল মালিকরা ২.৮০ ডলারের নিচে বিক্রি করতে পারেন না। মিল মালিকদের দাবি, এই দরে বিক্রি করলেও তাদের লোকসান হচ্ছে। রপ্তানিকারকরা বলছেন, বিদেশি ক্রেতারা বাড়তি দাম দেবেন না। তবে মিলাররা এই তুলনাকে অন্যায় মনে করছেন।
স্থানীয় সুতার দাম বেশি হওয়ার কারণ:
বাংলাদেশের স্পিনিং মিল মালিকদের দাবি, ভারত সরকার তাদের স্পিনিং মিল মালিকদের রপ্তানিতে নানা ধরনের সহায়তা ও প্রণোদনা দেয়। এ কারণে তারা প্রায় ০.৩০ ডলার বাড়তি সুবিধা পায়। এই সুবিধার কারণে ভারতীয় সুতা স্থানীয় বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে কম দামে বিক্রি হয়। স্থানীয় মিলগুলো এটিকে ‘ডাম্পিং’ হিসেবে দেখছেন।
খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, রপ্তানি রিবেট, প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিল, উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা এবং বিদ্যুৎ, জমি ও রাজ্য পর্যায়ের ভর্তুকি মিলিয়ে প্রতি কেজিতে প্রায় ০.৩০ ডলারের সমপরিমাণ সুবিধা পায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা।
অন্যদিকে বাংলাদেশে এই খাতে সহায়তা কমেছে। স্থানীয় সুতায় তৈরি পোশাকের জন্য নগদ প্রণোদনা একসময় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত থাকলেও এখন তা মাত্র ১.৫ শতাংশে নেমেছে। তিন বছর আগে গ্যাসের দাম এক লাফে ১৭৯ শতাংশ বেড়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) আওতায় কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগও কমে গেছে। এছাড়া আগে করের ক্ষেত্রে যেসব ছাড় ছিল, তা বাতিল হয়েছে।
এর বাইরে কিছু স্পিনিং মিল এখনই প্রয়োজন না থাকলেও অতি উচ্চ প্রযুক্তির ও অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি আমদানি করেছে, যার ফলে ব্যয় বেড়েছে। ব্যাংকের দায়ও বেড়ে গেছে। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
মধ্যপন্থা কি সম্ভব?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমদানিকৃত সুতার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যখন সরবরাহের উৎস সংকুচিত বা এককেন্দ্রিক হয়ে যায়। তবে হঠাৎ সস্তা কাঁচামাল পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করলে ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের উচিত ঢালাওভাবে আমদানি নিষেধাজ্ঞা না আরোপ করে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কার্যকর সমাধান খোঁজা।
সমাধানের মধ্যে থাকতে পারে সীমিত আকারে নগদ ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা, এলডিসি বিধিমালার আওতায় বিশেষ ঋণের সুবিধা, অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত, অথবা একটি কোটা ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ থাকবে। কেউ কেউ বলছেন, তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর সরকারের ০.৩ শতাংশ বিশেষ নগদ প্রণোদনা—যার পরিমাণ বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা—টেক্সটাইল খাতকে সরাসরি সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান স্বীকার করেছেন, সরকার বিকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করছে। তিনি বলেন, “টেক্সটাইল শিল্প যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিছু করতে হবে। আমরা সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে ভাবছি।”
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, “উপায় আছে। এটি মিশ্র পদ্ধতি হতে পারে—কিছু জায়গায় বিধিনিষেধ আরোপ এবং অন্য জায়গায় নিয়ম শিথিল করা, যাতে সব খাতই তাদের প্রাপ্য গুরুত্ব ও সুবিধা পায়।” তিনি আরও বলেন, “এই দুটি শিল্পকে আলাদা করে দেখার বদলে অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা উচিত। শুল্ক-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর ভারসাম্য রাখতে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।”
তার পরামর্শ, এনবিআর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প থেকে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে শুল্ক কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে বসার আহ্বানও দিয়েছেন তিনি।
আমদানি শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকে সহায়তার জন্য অন্যান্য বিকল্প পদক্ষেপ হিসেবে নগদ প্রণোদনা, ভর্তুকি, ঋণ ও অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
এখনকার মূল চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ও সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া। এক ভুল পদক্ষেপেই কয়েক দশকে গড়ে ওঠা ভ্যালু চেইন ভেঙে যেতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে যখন বাংলাদেশ অর্থনীতির আরেকটি ধাক্কা সামলাতে প্রস্তুত নয়।

