ফেনীর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)-তে আধুনিক শিল্পের উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে ২০১৮ সালে তিনটি ‘কম্পিউটার নিউমেরিক্যাল কন্ট্রোল’ (সিএনসি) মেশিন স্থাপন করা হয়। প্রতিটি মেশিনের দাম ছিল প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা। সূক্ষ্ম কাটিং ও শেপিংয়ের মতো কাজে ব্যবহৃত এই স্বয়ংক্রিয় মেশিনগুলো এখন বছরের পর বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, যান্ত্রিক ত্রুটি ও দক্ষ অপারেটরের অভাবই মূল কারণ। ফলে মূল্যবান এই যন্ত্রপাতি কার্যত কোনো কাজে আসছে না। কেন্দ্রটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন বলেন, এই মেশিনগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং প্রশিক্ষণের জন্য আনা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এগুলো সচল নেই। আমরা চেষ্টা করছি ঠিক করার, তবে বাজেট সংকটে কাজটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে।”
ফেনীর এই চিত্র একক ঘটনা নয়। এটি দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। একদিকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বহু প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক পদ শূন্য পড়ে আছে বছরের পর বছর। কোথাও কোথাও আবার নবনির্মিত কেন্দ্রেও নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা যায়নি, শুধু প্রকল্পভিত্তিক কিছু কোর্স চালু রয়েছে।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর পরিচালক (প্রোগ্রাম) মেরিনা সুলতানা গত এক দশকে অন্তত ১৫টি টিটিসি পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, “সরকারি নিয়মিত কোর্সগুলোতে সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে। কিছু প্রকল্পভিত্তিক কোর্সে সাময়িকভাবে শিক্ষক ও সুবিধা থাকে, কিন্তু প্রকল্প শেষ হলে সেগুলো আর ব্যবহৃত হয় না।”
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, দেশের সব টিটিসির বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছি। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন—কাঠামোগত দুর্বলতা না দূর করে এত দ্রুত টিটিসি সম্প্রসারণ কতটা কার্যকর? তাদের মতে, যথাযথ সংস্কার ছাড়া নতুন কেন্দ্র স্থাপন দক্ষতা বাড়ানোর বদলে অদক্ষতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা আরও বাড়াতে পারে।
বিএমইটি তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এবং ৬টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি চালু রয়েছে। এখানে মোট ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ-কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল দেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে আরও কেন্দ্র যুক্ত হয়। ২০০০ সালের পর এই সম্প্রসারণ দ্রুত গতি পায়।
২০০১–২০০৬ সালে ২৬টি এবং ২০১১–২০১৭ সালে আরও ২৭টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ২০১৬–২০২৬ সময়কালে ১,৬৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ৪০টি কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে আরও ৫০টি টিটিসি স্থাপনের জন্য ৩,৭৫১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদিত রয়েছে।
বিশ্ব শ্রমবাজার এখন দক্ষ কর্মীর দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখনো মূলত আধা-দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকই বেশি যাচ্ছে। রামরুর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী বাংলাদেশিদের মাত্র ২০–২২ শতাংশ দক্ষ, আর ৭০–৭৪ শতাংশই আধা-দক্ষ বা অদক্ষ। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, বিশ্ব এখন দক্ষতা নির্ভর নিয়োগে যাচ্ছে। তাই দক্ষ জনশক্তি তৈরি এখন সময়ের দাবি।”
২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রায় ১২.৭ লাখ মানুষ বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তবে এর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিএমইটি অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ শেষে বিদেশে চাকরি পাওয়ার হার নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা না গেলেও সূত্রগুলো বলছে, এটি গড়ে ২৫–৩০ শতাংশ। তবে কিছু ট্রেড যেমন ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং ও ওয়েল্ডিংয়ে এই হার তুলনামূলক বেশি।
ফেনী টিটিসিতে বর্তমানে সাতটি ট্রেড চালু রয়েছে—ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটার অপারেশন, ড্রেস ডিজাইন, মোবাইল সার্ভিসিং, ড্রাইভিং, অটো মেকানিক্স এবং মেশিন শপ। তবে গত ২৭ মার্চ পরিদর্শনে দেখা যায়, মেশিন শপ ও অটোমোবাইল সার্ভিসিং ট্রেড দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। নতুন অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু কোর্স পুনরায় চালু হয়েছে।
অটোমোবাইল ল্যাবের গেস্ট ইন্সট্রাক্টর শাকিল আহমেদ বলেন, সরঞ্জাম আছে, কিন্তু বেশিরভাগই শুধু দেখানোর জন্য। শিক্ষার্থীরা যন্ত্রাংশ চিনলেও বাস্তব কাজ শিখতে পারছে না।”
বিএমইটি-এর পরিচালক (প্রশিক্ষণ) সালাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, ১১০টি টিটিসির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে মাত্র ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। অথচ একটি কেন্দ্রের জন্যই প্রায় দেড় কোটি টাকা দরকার হতে পারে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সার্টিফিকেট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। অর্থনীতিবিদ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি এক আলোচনায় বলেন, বাংলাদেশে দক্ষতা প্রশিক্ষণের বড় দুর্বলতা হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব। তাই এসব সার্টিফিকেট অনেক সময় কাজে লাগে না।”
ফেনী টিটিসিতে অন্তত ১৬ জন প্রশিক্ষক প্রয়োজন হলেও আছেন মাত্র ২ জন স্থায়ী প্রশিক্ষক। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ টিটিসির অবস্থাও প্রায় একই। ২০২২ সালে নির্মাণ শেষ হলেও সেখানে এখনো পূর্ণ কার্যক্রম শুরু হয়নি। কেন্দ্রটির অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, ভবন ও সরঞ্জাম আছে, কিন্তু স্টাফ নেই। ৮৫টি অনুমোদিত পদের একটিও পূরণ হয়নি।”
ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ-জার্মান কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চাহিদা বেশি হলেও আসন সীমিত। কেন্দ্রটির অধ্যক্ষ ফওজিয়া ইসলাম বলেন, ড্রাইভিং, কম্পিউটার ও ভাষা কোর্সে প্রচুর চাহিদা আছে। কিন্তু সবাইকে সুযোগ দিতে পারি না।”
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, অনেক টিটিসিতে মৌলিক অবকাঠামো, আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষক নেই। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হয়, যা দক্ষতা উন্নয়ন নয়।”
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, নতুন কেন্দ্র বাড়ানোর আগে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা জরুরি। একটি টিটিসির অধ্যক্ষ বলেন, সব জায়গায় নতুন কেন্দ্র না করে ১০–১৫টি কেন্দ্রকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা উচিত। শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না থাকলে দক্ষতা তৈরি হবে না।” বিএমইটি-এর অতিরিক্ত মহাপরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, আমাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে, তবে আমরা সেটি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।”
সিভি/এম

