এক সময় বাংলাদেশে মেডিকেল পড়াশোনার জন্য সবচেয়ে বড় উৎস ছিল প্রতিবেশী ভারত, নেপালসহ কয়েকটি এশীয় দেশ। বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসত ভারত থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতীয়দের অংশ ৬৮ থেকে ৭২ শতাংশের মধ্যে থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা নেমে এসেছে ৪৪ শতাংশে। এর ফলে সামগ্রিক বিদেশি ভর্তির সংখ্যাও প্রভাবিত হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পতনের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে। একদিকে ভারত নিজ দেশেই মেডিকেল শিক্ষার সুযোগ দ্রুত বাড়িয়েছে, নতুন কলেজ ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বেসরকারি শিক্ষার খরচও অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে। ফলে আগে যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যেতেন, তারা এখন নিজ দেশেই সহজে সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী কিছু দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনও শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বিশ্ব চিকিৎসা শিক্ষা ফেডারেশনের পূর্ণ স্বীকৃতি এখনো না থাকায় অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে। এর ফলে তারা তুলনামূলকভাবে অন্য দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছে, যেখানে স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও প্রতিষ্ঠিত।
অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কিছু বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশে পড়তে আসার আগ্রহ কিছুটা কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর ওপর। বিদেশি শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ভর্তি কমে যাওয়ায় অনেক কলেজ আর্থিক চাপে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে শিক্ষার মান ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারি পর্যায়ে অবশ্য পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে নীতিগত কিছু শিথিলতার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরে আসে।
একই সঙ্গে নতুন বাজার হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রচারণা বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে আগে প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারের শিক্ষার্থীরা আসতেন, সেই প্রবাহ আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান চিত্র বলছে, বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার আন্তর্জাতিক আকর্ষণ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। সংখ্যার এই পতন শুধু ভর্তি সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে এই খাত আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

