বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত আসনসংখ্যা, দীর্ঘ ভর্তি প্রতিযোগিতা এবং ক্রমবর্ধমান উচ্চশিক্ষার চাহিদার প্রেক্ষাপটে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো লাখো শিক্ষার্থীর জন্য বিকল্প নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু গত কয়েক দশকে ব্যাঙের ছাতার মতো বিস্তার লাভ করা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আকাশচুম্বী ব্যয়, শিক্ষার মান এবং ডিগ্রি অর্জনের পর কর্মসংস্থানের বাস্তবতা নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশে ইউজিসি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১০টির বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখের (প্রায় ৩ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি) বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
ইউজিসি-এর প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এমন বিষয় বেছে নিচ্ছেন, যেগুলোর সঙ্গে সরাসরি কর্মসংস্থান ও পেশাগত সুযোগের সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি বিষয়ে। মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৩.৯০ শতাংশ এই অনুষদের অধীনে অধ্যয়ন করছেন, যা দেশের তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও শিল্পখাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রতিফলন।
একইভাবে ব্যবসায় শিক্ষা বা কমার্স অনুষদও শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান পছন্দের ক্ষেত্র হিসেবে রয়েছে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী ব্যবসায় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যয়ন করছেন। ব্যাংকিং, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট ব্যবস্থাপনা, বিপণন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের মতো পেশায় বিস্তৃত কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় এ খাতের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধারাবাহিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে সামাজিক বিজ্ঞান এবং কলা ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ইউজিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর হার ৩.৪৯ শতাংশ, আর কলা ও মানবিক বিভাগে এই হার ১১.০৭ শতাংশ। এসব তথ্য থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের কথা বিবেচনা করে এমন বিষয় নির্বাচন করছেন, যেগুলোর সঙ্গে চাকরির বাজারের প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে এবং যেগুলো বর্তমান অর্থনীতি ও শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিপুল অর্থ ব্যয় করে অর্জিত এই ডিগ্রি কি শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা এবং প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারছে?
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার ব্যয় দেশের অধিকাংশ পরিবারের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এখানে খরচ প্রায় সাত থেকে পনেরো গুণ বেশি। একটি চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে ব্যয় হচ্ছে সর্বনিম্ন ৪ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় যাতায়াত, আবাসন, শিক্ষাসামগ্রী এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ। ফলে অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারকে সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য জমি বিক্রি করতে, সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা ঋণের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ায় শিক্ষাব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ওপরই বর্তাবে।
তবে উচ্চ ব্যয় সবসময় উচ্চমানের শিক্ষা নিশ্চিত করে না। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং ইউজিসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সমান নয়। একদিকে দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রম, আধুনিক গবেষণাগার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দক্ষ শিক্ষকের মাধ্যমে নিজেদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (DIU) ,ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ULAB),ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (UAP) সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সুনাম অর্জন করেছে।
অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই, পর্যাপ্ত গবেষণাগার বা সমৃদ্ধ লাইব্রেরি নেই। অনেক ক্ষেত্রে খণ্ডকালীন শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে পাঠদান পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ উচ্চশিক্ষাকে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রের পরিবর্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম হিসেবে পরিচালনা করছে, যেখানে শিক্ষার গুণগত মানের চেয়ে ভর্তি বৃদ্ধি ও আর্থিক লাভকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চাকরির বাজারে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবস্থানও একরৈখিক নয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) একটি পূর্ববর্তী সমীক্ষা অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানের হার প্রায় ৪৪ শতাংশ, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩২ শতাংশ কর্মসংস্থান হারের তুলনায় কিছুটা বেশি। এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাধারণত সেশনজটমুক্ত পরিবেশে নির্ধারিত সময়ে পড়াশোনা শেষ করতে পারেন। ফলে তারা দ্রুত চাকরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ পান। এছাড়া প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইংরেজি ভাষা দক্ষতা, উপস্থাপনা কৌশল, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং আধুনিক সফট স্কিল উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ফলে ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, তৈরি পোশাক শিল্প এবং বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানে তাদের চাহিদা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি উদ্বেগজনক বাস্তবতাও রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম সময়োপযোগী নয় এবং শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতিতে ভোগেন। নিয়োগদাতারা প্রায়ই অভিযোগ করেন, অনেক নতুন গ্র্যাজুয়েটের সমস্যা সমাধান, বিশ্লেষণী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে।
এর ফলে নিম্নমানের অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জনের পরও কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছেন না। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় বেকার থাকছেন, আবার অনেকে স্বল্প বেতনের চাকরিতে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অর্থনীতিবিদরা এই অবস্থাকে “আন্ডার-এমপ্লয়মেন্ট” বা আংশিক কর্মসংস্থান হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় তার কর্মক্ষেত্রের মান ও আয় অনেক কম থাকে।
পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্যও এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার ব্যয় তুলনামূলকভাবে খুবই কম, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেশনজট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা শিক্ষাজীবনকে দীর্ঘায়িত করে। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দ্রুত স্নাতক সম্পন্ন করার সুযোগ দিলেও শিক্ষার্থীদের বহন করতে হয় বিপুল আর্থিক ব্যয়।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা অনুদান এবং বৃহৎ ক্যাম্পাস ভিত্তিক শিক্ষা পরিবেশ তুলনামূলক শক্তিশালী হলেও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে এগিয়ে রয়েছে। একইভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিসিএস, সরকারি চাকরি ও গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার দিকে বেশি ঝোঁকেন, আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা বেশি যুক্ত হন করপোরেট ও বেসরকারি খাতে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষা খাতকে আরও কার্যকর করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, ইউজিসির তদারকি আরও কঠোর করতে হবে, যাতে মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার নামে বাণিজ্য পরিচালনা করতে না পারে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, গবেষণা সুবিধা ও শিক্ষার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি যৌক্তিক টিউশন ফি কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যাতে পাঠ্যক্রম সরাসরি কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী হালনাগাদ করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সায়েন্স, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং অন্যান্য উদীয়মান খাতের দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত উন্নয়নের ওপর। কারণ বিপুলসংখ্যক তরুণ আজ এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। তাই ব্যয়বহুল ডিগ্রি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে মানসম্মত শিক্ষা, বাস্তব দক্ষতা এবং টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত হবে। অন্যথায় উচ্চশিক্ষা একটি ব্যয়বহুল সনদে পরিণত হবে, যা ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র—সবার জন্যই হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল ডিগ্রি প্রদান নয়, বরং দক্ষ, উদ্ভাবনী এবং প্রতিযোগিতামূলক মানবসম্পদ তৈরি করা। সেই লক্ষ্য অর্জনেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত সাফল্য নিহিত।

