বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় গভীর শিখন সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সরকারি মূল্যায়নে। শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষায় অংশ নিলেও বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগ, সমস্যা বিশ্লেষণ কিংবা স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখনও পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষার চক্রে আটকে আছে। ফলে পাঠ্যবিষয় বোঝার পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির প্রবণতা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে ভাষা দক্ষতা, বিশ্লেষণী চিন্তা, সমস্যা সমাধান ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতার ওপর।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অনেক শিক্ষার্থী সাধারণ একটি অনুচ্ছেদ পড়ে তার মূল বক্তব্য বুঝতে হিমশিম খায়। আবার গণিতের মৌলিক ধারণা, বিশেষ করে জ্যামিতি ও যুক্তিনির্ভর সমস্যার সমাধানেও দুর্বলতা স্পষ্ট। শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে সূত্র মুখস্থ করতে পারলেও সেই সূত্র বাস্তব সমস্যায় প্রয়োগ করতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো শেখাকে পরীক্ষার নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে আগ্রহী হলেও বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করার সুযোগ বা আগ্রহ দুটোই কমে যাচ্ছে।
মূল্যায়নে আরও দেখা গেছে, ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে ইংরেজি সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। নিজস্ব ভাষায় চিন্তা প্রকাশ, স্বাধীনভাবে লেখা এবং যুক্তি উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পিছিয়ে। ইংরেজিতে সৃজনশীল বা স্বাধীন লেখার দক্ষতায় শিক্ষার্থীদের বড় অংশই কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলা বিষয়েও পরিস্থিতি পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবিষয়ের সারবস্তু বুঝতে পারলেও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দুর্বলতা দেখিয়েছে। ভাষাকে যোগাযোগ ও চিন্তার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির প্রবণতা এখানে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
গণিত বিষয়ে সংকট আরও প্রকট। মূল্যায়নে দেখা গেছে, অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই উচ্চতর দক্ষতার স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে। বিশেষ করে জ্যামিতি, যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বহুস্তরীয় সমস্যা সমাধানে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাবিদদের মতে, গণিতভীতি এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি এই দুর্বলতার অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদনটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও বড় ধরনের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছে। কিছু বিভাগ তুলনামূলক ভালো ফল করলেও কয়েকটি অঞ্চল প্রায় সব বিষয়েই পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীরা ভাষা ও গণিত উভয় ক্ষেত্রেই শহুরে শিক্ষার্থীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে।
শহর-গ্রামের ব্যবধান শিক্ষাখাতে দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, প্রযুক্তি, দক্ষ শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী এবং সহায়ক শিক্ষার সুযোগের অসম বণ্টন এই বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংকট এখনও বড় বাস্তবতা।
প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যও স্পষ্ট হয়েছে এই মূল্যায়নে। সাধারণ ধারার স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রায় সব বিষয়েই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষা দক্ষতার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরও সমন্বিত করা না গেলে এই পার্থক্য ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
তবে মূল্যায়নে একটি ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। ভাষা বিষয়ে মেয়েশিক্ষার্থীরা ছেলেদের তুলনায় ভালো ফল করেছে। বিশেষ করে বাংলা বিষয়ে তাদের পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে গণিত ও বিজ্ঞানে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি, যা লিঙ্গসমতার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফলকে শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা, কোচিংনির্ভর শিক্ষা, মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতি এবং শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার ঘাটতি মিলেই বর্তমান পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
তাদের ভাষায়, একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে কতটা বুঝে শিখছে। একজন শিক্ষার্থী যদি বাস্তব জীবনের সমস্যা বিশ্লেষণ করতে না পারে, নিজের ভাষায় মত প্রকাশ করতে না পারে কিংবা নতুন পরিস্থিতিতে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে না পারে, তাহলে ভালো ফলাফলও প্রকৃত শিক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষার মানোন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ আরও কার্যকর করা, শ্রেণিকক্ষে দক্ষতাভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক পাঠদান বাড়ানো, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়ক কার্যক্রম চালু করা এবং পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া জেলা ও বিভাগভিত্তিক শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণ, তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাকৌশল তৈরির পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে এনে বিশ্লেষণী ও সৃজনশীল চিন্তার দিকে নিয়ে যেতে না পারলে ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
সাম্প্রতিক এই মূল্যায়ন তাই শুধু শিক্ষার্থীদের ফলাফলের হিসাব নয়; বরং দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছে। এটি স্পষ্ট করেছে যে, এখন সময় এসেছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে দক্ষতাকেন্দ্রিক শিক্ষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার। অন্যথায় বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও পাসের হার বাড়লেও প্রকৃত শেখার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

