দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় দেশের ৬২১টি ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। বছরের পর বছর শিক্ষার্থী না থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরকারি অর্থে পরিশোধ করা হচ্ছে।
এতে একদিকে সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এ বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, নীতিমালা অনুযায়ী প্রথম ধাপে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পাঠদানের অনুমোদন বাতিল এবং প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
গত ২৫ জুন সংশ্লিষ্ট ৬২১টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ পাঠানো হয়। এতে আগামী ২২ জুলাইয়ের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দিতে বলা হয়েছে। কেন আগামী ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করা হবে এবং কেন প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি বাতিল বা প্রত্যাহার করা হবে না—সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে যেসব এসএসসি (ভোকেশনাল) ও দাখিল (ভোকেশনাল) প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না, সেগুলো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মৌলিক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিবেচিত হতে পারে। তাই বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থী ভর্তি, পরীক্ষার ফলাফল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যোগ্য শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা কমিটি, আসবাবপত্র, ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম, গ্রন্থাগার এবং অনুমোদনের সময় আরোপিত অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সরকারের অনুমোদনক্রমে সেই প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি বাতিল বা প্রত্যাহার করতে পারে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া ৬২১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৪৩টি এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং ১৭৮টি দাখিল (ভোকেশনাল) পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থী না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেই কার্যত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারিগরি শিক্ষার মূল লক্ষ্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীই নেই, সেখানে শিক্ষক-কর্মচারী রেখে সরকারি অর্থ ব্যয় করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কারিগরি শিক্ষার সামগ্রিক মান ও ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল প্রতিষ্ঠান বন্ধ করাই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কেন শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে না, তার কারণও খুঁজে বের করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামোর দুর্বলতা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, দক্ষ শিক্ষকের সংকট, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা কম থাকায় ভর্তির হার কমে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করা, মানোন্নয়ন করা অথবা নতুন চাহিদাভিত্তিক ট্রেড চালুর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা না করেও সরকারি সুবিধা ভোগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়াকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। তাদের মতে, কার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাখ্যা পাওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে। এরপর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারে এবং নীতিমালার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের ভর্তি কার্যক্রম স্থগিতের পাশাপাশি পাঠদানের অনুমোদনও বাতিল করা হতে পারে।

