সারা দেশে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। তবে পরীক্ষা শুরুর দিনই উদ্বেগজনক একটি চিত্র সামনে এসেছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এ বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।
অর্থাৎ এসএসসি পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফরমই পূরণ করেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু পরীক্ষায় অনুপস্থিতির বিষয় নয়; বরং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার একটি বড় সংকেত, যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকাল থেকে সারা দেশের দুই হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা শুরু হয়। এবার মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। পরীক্ষা নির্বিঘ্ন করতে পরীক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশ করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেহে ধারণযোগ্য ক্যামেরা ব্যবহার করছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে মাত্র প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছে। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নিয়মিত শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।
গত বছরের তুলনায় এ অনুপস্থিতির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এক বছরের ব্যবধানে সেই হার বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা শিক্ষা খাতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষা বোর্ডভিত্তিক তথ্যেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ৩৩ শতাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পর্যায়ে এই হার ৪৪ শতাংশের বেশি। আর বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সেখানে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৫৫ শতাংশ এ বছর পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি।
কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে রয়ে গেল, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি শিক্ষা প্রশাসন। তবে পূর্ববর্তী বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে কয়েকটি কারণ বারবার উঠে এসেছে। এর মধ্যে বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, পারিবারিক আর্থিক সংকট, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এবং এসএসসি পাসের পর অনেক শিক্ষার্থীর কর্মজীবনে যুক্ত হয়ে পড়া অন্যতম।
গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ এখনো বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। পাশাপাশি অনেক পরিবার অর্থনৈতিক চাপে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে কর্মসংস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হার নয়, এই প্রবণতা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া মানে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে।
এদিকে শিক্ষা উপদেষ্টা এ এন এম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, অনুপস্থিতির হার কেন এত বেড়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যে কারণগুলো উঠে আসবে, সেগুলোর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেছেন, অনেক শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় নির্ধারিত বছরে পরীক্ষায় অংশ নেয় না। তারা পরবর্তী বছরে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল প্রস্তুতির অভাব দিয়ে এত বড় অনুপস্থিতি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়; এর পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও গভীরভাবে জড়িত।
এ বছর লিখিত পরীক্ষা ২১ দিনের মধ্যে শেষ হবে। যেসব দিনে পরীক্ষা থাকবে না, সেসব দিনে পরীক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চালু থাকবে।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। আগামী বছর থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অভিন্ন বিষয়গুলোর পরীক্ষাও একই প্রশ্নপত্রে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সরকার সতর্ক করেছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, শিক্ষা ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের চাপের মতো সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না গেলে আগামী বছরগুলোতেও এই অনুপস্থিতির হার আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু পরীক্ষা পরিচালনা নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

