দেশের উন্নয়ন কৌশল নিয়ে আলোচনা হলেই শিক্ষা খাতকে আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং শিল্পের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ জোরদারের কথা উঠে আসে। প্রায় প্রতিটি সরকারই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সংস্কার পরিকল্পনাকে নিজেদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু বাজেটের বাস্তব চিত্র বলছে, এসব প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) প্রকাশিত ‘ব্রেকিং দ্য ডেট ট্র্যাপ: পলিসি পেপার অন রিস্টোরিং ফিসক্যাল স্পেস টু সেভ এডুকেশন’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ১১৩টি দেশ বর্তমানে শিক্ষা খাতের তুলনায় ঋণ পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করছে। বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধের ব্যয় শিক্ষা বাজেটের গড়ে ৩ দশমিক ৩ গুণ।
বাংলাদেশের পরিস্থিতিও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে। চলতি অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। অথচ আগামী অর্থবছরে শুধু আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন কোনো ঋণ গ্রহণ না করলেও অতীতের দায় পরিশোধে যে অর্থ ব্যয় হবে, তা শিক্ষা খাতের পুরো বরাদ্দের তিন গুণেরও বেশি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঋণ পরিশোধের বড় অংশই বৈদেশিক নয়; বরং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের জন্য ব্যয় হচ্ছে। মোট ঋণ পরিশোধের প্রায় ৬২ শতাংশই যাচ্ছে দেশীয় ব্যাংক ও অন্যান্য ঋণদাতার কাছে। আগামী অর্থবছরে ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ পরিশোধে প্রয়োজন হবে ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা এক অর্থবছরে এ ধরনের সর্বোচ্চ ব্যয়। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের মেয়াদপূর্তিতে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা এবং সুদ বাবদ আরও ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ফলে উচ্চ সুদ ও স্বল্পমেয়াদি অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক চাপের বিষয় নয়; বরং বাজেটে অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রশ্নও। প্রয়োজন হলে সরকার অন্যান্য খাতের ব্যয় পুনর্বিন্যাস করে শিক্ষা বাজেটকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বাজেট প্রণয়নে সেই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন সব সময় দেখা যায় না।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মতো দৃশ্যমান প্রকল্পে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার মান বৃদ্ধির মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। ফলে শিক্ষার পরিধি বাড়লেও গুণগত উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয় না।
এদিকে রাজস্ব ব্যয়ের প্রায় ১৩ শতাংশ এখন শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের স্বল্পমেয়াদি অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার প্রভাব শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য সামাজিক খাতেও পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প অর্থায়নের পথ হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঋণবিনিময় (ডেট-সোয়াপ) পদ্ধতির আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ব্যবস্থায় ঋণদাতা দেশ বৈদেশিক ঋণের একটি অংশ মওকুফ করে এবং ঋণগ্রহীতা দেশ সমপরিমাণ অর্থ নিজস্ব মুদ্রায় শিক্ষা খাতে ব্যয় করার অঙ্গীকার করে। জার্মানি–ইন্দোনেশিয়া এবং স্পেন–এল সালভাদরের মধ্যে এমন চুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি ইউনেস্কোও এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকারগুলোর উদ্দেশ্যে একটি কারিগরি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বৈদেশিক ঋণদাতাদের সঙ্গে এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থার সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে এই পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর সুফল পেতে সময় লাগে এবং সব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ যেহেতু অভ্যন্তরীণ ঋণ, তাই সমাধানের পথও মূলত দেশীয় নীতির মধ্যেই খুঁজতে হবে। স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ সুদের ঋণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি এবং তুলনামূলক কম সুদের অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষা বাজেটকে এমন একটি সুরক্ষিত ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যাতে রাজস্ব সংকট দেখা দিলেও এটি প্রথম ধাক্কার শিকার না হয়।
এ ছাড়া কম উৎপাদনশীল খাতের ব্যয় পুনর্বিন্যাস করে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি ঋণ গ্রহণ, ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের ঋণনীতি স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়।
শিক্ষা কোনো বিলাসী ব্যয় নয়; এটি একটি দেশের মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ভিত্তি। তাই ঋণ পরিশোধের চাপ যতই বাড়ুক, সেই চাপ যেন শিক্ষা খাতের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করা নীতিনির্ধারকদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অন্যথায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান এবং সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে।

