স্নাতক বা সমমানের যোগ্যতা নিয়ে নিয়োগ পেলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা এখনো তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবেই গণ্য হচ্ছেন। প্রশিক্ষণ ছাড়া তাঁরা বেতন পান ১৪তম গ্রেডে, প্রশিক্ষণ শেষ করলে ১৩তম গ্রেডে। দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ সহকারী শিক্ষক আছেন। পদমর্যাদা ও বেতন নিয়ে তাঁদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আজও মেটেনি। আজ সোমবার, ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।
এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ গঠনে ৬০ বছরের অঙ্গীকার’। শিক্ষকতার মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়ন নিয়ে নানা আলোচনা হয়। কিন্তু প্রাথমিকের শিক্ষকদের পদমর্যাদা ও বেতনের দাবি এখনো বাস্তবে রূপ পায়নি।
শিক্ষকদের অসন্তোষের মূল কারণ বৈষম্যের অনুভূতি। সরকারের অন্যান্য চাকরিতে স্নাতক বা সমমানের যোগ্যতা চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পদ সাধারণত দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পায়। সেসব পদে বেতনও দেওয়া হয় ১০ম গ্রেডে। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রাথমিকের শিক্ষকেরা কেন নিচের ধাপে থাকবেন, এই প্রশ্নই এখন তাঁদের আন্দোলনের কেন্দ্রে।
এ দাবিতে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকেরা বেতন স্কেল ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার আন্দোলন করছেন। প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদের সমন্বয়ক মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, সরকারের অন্য যেসব চাকরিতে স্নাতক বা সমমান যোগ্যতা লাগে, সেখানে ১০ম গ্রেড দেওয়া হচ্ছে। তাহলে শিক্ষকদের দোষ কোথায়? তাঁর মতে, এ কারণেই মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে চান না। তিনি আরও বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার পরও একজন মেধাবী শিক্ষার্থী কেন তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদা পাবেন, সেটি রাষ্ট্রের গুরুত্ব দিয়ে বোঝা উচিত।
এই বক্তব্যের পেছনে একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন আছে। প্রাথমিক শিক্ষা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। সেখানে মেধাবী ও যোগ্য মানুষ না এলে পুরো ব্যবস্থার মানই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বেতন ও মর্যাদা কম হলে পেশাটি আকর্ষণ হারায়, আর তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শিক্ষার্থীদের। তবে পদমর্যাদা ও গ্রেড বদলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরকারের বাজেট ও অন্য পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়ও জড়িত। তাই এ দাবি পূরণে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও আর্থিক প্রস্তুতি দুটিই দরকার হবে।
শুধু পদমর্যাদা নয়, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেও বড় ঘাটতি আছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৪০ দশমিক ৫২ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণের বাইরে ছিলেন। মাদরাসা শিক্ষায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার আরও কম। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন মাধ্যমিক শিক্ষকের মধ্যে চারজনেরই পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই।
প্রাথমিকের ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ বেতন কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রশিক্ষণ না থাকলে গ্রেড এক ধাপ নিচে থাকে। এতে প্রশিক্ষণকে পেশার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখার বদলে বাড়তি যোগ্যতা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে মনে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা বাড়াতে হলে যোগ্যতা অনুযায়ী পদমর্যাদা ও বেতন নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে নিয়োগের আগেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। বিশ্বের অনেক দেশে পেশাগত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষক সনদ অর্জনের পরই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘মাধ্যমিক শিক্ষায় শিখন ত্বরান্বিতকরণ’ (লেইস) প্রকল্পের আওতায় তিন লাখ ৬৭ হাজার ৪৯০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রশিক্ষণ ফাউন্ডেশন কোর্স নয়। অর্থাৎ নিয়োগের আগে বা শুরুতে যে মৌলিক প্রশিক্ষণ দরকার, এটি তার বিকল্প হবে না।
সব মিলিয়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যে মর্যাদা ও পেশার সুরক্ষার কথা বলা হলেও দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের বাস্তবতা এখনো ভিন্ন। প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিক্ষকের দাবি ১০ম গ্রেড। অন্যদিকে প্রশিক্ষণব্যবস্থাতেও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। সরকার এসব দাবি ও সংস্কারের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে শিক্ষকতা পেশা মেধাবীদের কাছে কতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

