এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। এর পাশাপাশি এই শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ার গঠনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। আগামী বছর থেকেই এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে ‘চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থী সম্মেলন-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, আগামী বছর থেকে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আবার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা আছে। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হয়েছে, সেসব বিষয়ে দ্রুত পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরির বিষয়টি সরকার ইতিবাচকভাবে দেখবে।
উপদেষ্টা বলেন, এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার দায় এড়াতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, অকৃতকার্য ও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে তাদের যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ করে দিতে।
তিনি জানান, এই শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হতে পারে। যাঁদের ব্যবসার ভালো ধারণা আছে, তাঁদের জন্য প্রাথমিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, জাপানি, কোরীয়, চীনা কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা আছে। তিন থেকে ছয় মাসের ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি কাজে যুক্ত হতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু এসএসসি, এইচএসসি বা অনার্সের সনদ থাকলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মেলে না। দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান থাকলে কাজের সুযোগ বাড়ে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মাহদী আমিন বলেন, এসএসসিতে ভালো ফল করলেই জীবনে সাফল্য নিশ্চিত হয় না। আবার পরীক্ষায় খারাপ করলেই কেউ ব্যর্থ হয়ে যায় না। কেউ খেলাধুলায়, কেউ সংস্কৃতিতে, কেউ বিজ্ঞানের উদ্ভাবনে, আবার কেউ ব্যবসায় ভালো করতে পারে। একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে কারও অন্য প্রতিভা ও সৃজনশীলতাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।
পরীক্ষার খাতা পুনর্নিরীক্ষণ নিয়েও কথা বলেন তিনি। উপদেষ্টা জানান, আগে পুনর্নিরীক্ষণে মূলত নম্বরের যোগ-বিয়োগ ঠিক আছে কি না, তা দেখা হতো। এখন উত্তরপত্রের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ঘোষণার তাৎপর্য বোঝা যায় বর্তমান ব্যবস্থার দিকে তাকালে। এসএসসিতে অকৃতকার্য হলে শিক্ষার্থীকে সাধারণত পরের বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এই এক বছরে অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে দেন, কেউ কেউ কাজে নেমে পড়েন, আবার কিশোরীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের ঝুঁকিও বাড়ে। অপেক্ষার সময় তিন থেকে ছয় মাসে নামিয়ে আনা গেলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা অনেকটা রক্ষা পেতে পারে। শুধু ব্যর্থ বিষয়গুলোতে দ্রুত পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ পরীক্ষা আবার দিতে হবে না, যা মানসিক চাপও কমাবে।
কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও প্রাথমিক অর্থায়নের উদ্যোগও প্রাসঙ্গিক। দেশে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করা বহু তরুণ দক্ষতার অভাবে ভালো কাজ পান না। যারা পাস করতেই পারেননি, তাঁদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করা সামাজিক সুরক্ষার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা শিক্ষা বাস্তবসম্মত একটি ধাপ, কারণ জাপান, কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা আছে।
তবে বেশ কিছু প্রশ্ন এখনো খোলা। সরকার বিষয়টি ‘বিবেচনা’ করছে বলা হয়েছে, কিন্তু কবে এবং কীভাবে তা কার্যকর হবে, তার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। কতজন শিক্ষার্থী এর আওতায় আসবেন, এর জন্য আলাদা পরীক্ষার আয়োজন কীভাবে হবে এবং শিক্ষাবোর্ডগুলোর প্রস্তুতি কেমন, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি। ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও বাজেট কোথা থেকে আসবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। ব্যবসার জন্য প্রাথমিক অর্থায়ন কোন শর্তে এবং কত পরিমাণে দেওয়া হবে, তা-ও জানা যায়নি। বেশির ভাগ বক্তব্যই পরিকল্পনা ও সম্ভাবনার পর্যায়ে আছে, কার্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
পুনর্নিরীক্ষণ পদ্ধতিতে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন চালুর কথাও গুরুত্বপূর্ণ। আগে যোগ-বিয়োগের ভুল ধরা পড়লেই নম্বর বদলাত, এখন খাতা নতুন করে মূল্যায়ন হলে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে এতে বোর্ডের কাজের চাপ ও সময় বাড়বে, এবং এর জন্য স্পষ্ট নিয়ম ও জবাবদিহি লাগবে।
সব মিলিয়ে উদ্যোগটি অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য আশার বার্তা দিলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। আপাতত নজর থাকবে, আগামী বছর থেকে সত্যিই এই ব্যবস্থা চালু হয় কি না এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড ও মন্ত্রণালয় এ জন্য কী নীতিমালা তৈরি করে, সেদিকে।

