চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা সংকট। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের পরিবর্তন এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা। তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, শৃঙ্খলার অবনতি এবং শিক্ষকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার মতো বিষয়গুলো শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে প্রভাবিত করছে।
তবে এইচএসসির ফল খারাপ হওয়ার পেছনে শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের অবনতিকে দায়ী করতে নারাজ শিক্ষাবিদরা। তাঁদের মতে, করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদি শিখনঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, পাঠদান পদ্ধতির দুর্বলতা এবং শিক্ষাব্যবস্থার পুরোনো সমস্যাগুলোও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্কের ধরনে পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কোথাও শিক্ষকদের হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে, কোথাও শিক্ষার্থীদের আচরণে পরিবর্তন দেখা গেছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আগের মতো স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ইংরেজি শিক্ষক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, চলতি বছর শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচিতে পরীক্ষা দিয়েছে। পাশাপাশি আগের তুলনায় পরীক্ষার পরিবেশও বেশি সুষ্ঠু ছিল। আগে পরীক্ষার্থীরা যেসব অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেত, এবার সেগুলো না থাকাও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে পরীক্ষার পরিবেশের বাইরেও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বেশ কিছু সমস্যা ছিল। তাঁর মতে, জুলাই আন্দোলন এবং পরবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। একই সঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহও কমে এসেছে।
আরিফুর রহমান বলেন, বর্তমানে কিছু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ছাড়াই বিভিন্ন ব্যক্তিকে নেতৃত্বের অবস্থানে যেতে দেখে তাদের একটি অংশের মধ্যে পড়াশোনার গুরুত্ব নিয়ে ভিন্ন ধারণা তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় এবং পরীক্ষায় অপরিচিত ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াও শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এক রকম নয়। এখনো অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং নিজেদের সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের অবদানকে গুরুত্ব দেয়।
সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলের শিক্ষার্থী অর্ণব এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছে। শিক্ষকদের ভূমিকা সম্পর্কে সে জানায়, তারা শিক্ষকদের সম্মান করে এবং নিজেদের ভালো ফলের পেছনে শিক্ষকদের পরিশ্রমকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
অন্যদিকে দেশের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ ও শ্রদ্ধাশীল আচরণের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, যা নিয়মিত পাঠদানকে কঠিন করে তুলছে।
যশোরের অভয়নগর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক অঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, কিছু শিক্ষার্থী পাঠদান চলাকালেই শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। শিক্ষকদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণের ঘটনাও ঘটছে। তাঁর মতে, করোনা মহামারির পর অনেক শিক্ষার্থী এখনো পুরোপুরি পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর কিছু শিক্ষার্থীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো দাবি আদায়ে জোর প্রয়োগের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি মাদকাসক্তি এবং অনলাইনে জুয়ায় জড়িয়ে পড়ার মতো সমস্যাও কিছু শিক্ষার্থীর আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষকদের মধ্যেও একধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের হেনস্তার ঘটনার কারণে অনেকেই এখন শ্রেণিকক্ষে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
ঢাকার একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের পর থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। কোনো বিষয়ে আলোচনা করলে শিক্ষার্থীরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা নিয়ে শিক্ষকদের অনেক সময় চিন্তা করতে হয়।
ওই শিক্ষক বলেন, সব শিক্ষার্থীর আচরণ এক নয়। এখনো অনেক ভদ্র ও দায়িত্বশীল শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে তাঁর অভিজ্ঞতায় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের আচরণে আগের তুলনায় ঔদ্ধত্য বেড়েছে। এর ফলে শিক্ষকদের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাঠদানের পরিবেশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষকদের এসব উদ্বেগের পাশাপাশি শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, সমস্যার গভীরতা আরও বেশি। শিক্ষার্থীদের আচরণ কিংবা পড়াশোনায় অনাগ্রহকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখলে শিক্ষাব্যবস্থার মূল দুর্বলতাগুলো আড়ালে থেকে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, করোনা মহামারির সময় শিক্ষার্থীদের যে শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা অনেক ক্ষেত্রেই এখনো পূরণ হয়নি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু হওয়া দুর্বলতা নিয়েই অনেক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করা হলে তা প্রকৃত সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার শামিল হবে। কারণ, শিক্ষার্থীদের আচরণ ও পড়াশোনার ওপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশেরও বড় প্রভাব রয়েছে।
তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের আবার নিয়মিত পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিকল্পনার ঘাটতি নিয়েও সমালোচনা করেন এই শিক্ষাবিদ। তাঁর মতে, কার্যকর শিক্ষানীতি ও সুপরিকল্পিত পাঠ্যক্রম উন্নয়নের অভাবে শিক্ষা খাতের অগ্রগতি অনেকটা অপরিকল্পিত নগরায়ণের মতো হয়ে পড়েছে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনজুর আহমেদও মনে করেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের অবনতি শিক্ষার পরিবেশে প্রভাব ফেলছে। তবে শিক্ষার্থীদের মনোযোগের অভাবই একমাত্র সমস্যা নয়। পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষা পরিচালনার ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তাঁর মতে, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপিয়ে দেন। অথচ শিক্ষার মান কমে যাওয়ার পেছনে ব্যবস্থাগত দুর্বলতাও রয়েছে, যা যথাযথভাবে চিহ্নিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রেণিকক্ষের সময়সূচি অত্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত। অনেক ক্ষেত্রে একটি ক্লাসের সময় মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। এত অল্প সময়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বিস্তৃত পাঠ্যসূচি কার্যকরভাবে শেষ করা শিক্ষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে শুধু শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই শিক্ষার মান উন্নত হবে না। পাঠদান পদ্ধতির উন্নয়ন, পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ এবং শিক্ষকদের কার্যকরভাবে পাঠদানের সুযোগ তৈরি করাও প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এইচএসসির ফলাফলে যে অবনতি দেখা গেছে, তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সমস্যাগুলোর গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। করোনা মহামারির শিখনঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তন এবং পাঠদানের সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
এ অবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে শিক্ষকদের নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী করে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষার্থীদের যেমন দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদেরও নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করার উদ্যোগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান করা কঠিন হবে।

