এক সময় বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলো শুধু ছবি দেখার জায়গা ছিল না, ছিল একেকটি মিলনমেলা। যেখানে দর্শকরা একসাথে বসে বড় পর্দায় গল্প দেখতেন, হাসতেন, কাঁদতেন, আর কয়েক প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে এই প্রেক্ষাগৃহগুলোকে ঘিরে। কিন্তু আজ সেই চেনা দৃশ্যপট প্রতিদিন একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে।
সবশেষ উদাহরণ এসেছে রংপুর আর ভৈরব থেকে। দুই ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। রংপুরের শাপলা টকিজ গত ৩১ জুলাই শেষ প্রদর্শনীর পর চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে, আর কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মধুমতি সিনেমা হলও বন্ধ হওয়ার পরপরই ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গেছে। এই দুটি ঘটনা বাংলাদেশের একক পর্দার প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসার দীর্ঘদিনের সংকটেরই সবশেষ প্রতিচ্ছবি, যেখানে কমতে থাকা দর্শক সংখ্যা, ক্রমাগত লোকসান আর ব্যবসাসফল ছবির অভাব হল মালিকদের জন্য টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
রংপুরে থেমে গেল এক অধ্যায়
১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত শাপলা টকিজ প্রায় পাঁচ দশক ধরে রংপুরের দর্শকদের বিনোদন জুগিয়েছে। গত ৩১ জুলাই এই হলে শেষবারের মতো ছবি প্রদর্শিত হয়, এরপর হলটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। হল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সারা বছর ধরে ব্যবসাসফল বাংলা ছবির তীব্র সংকট চলছিল, শুধু ঈদের মুক্তি দিয়ে সারা বছরের খরচ তোলা সম্ভব হচ্ছিল না। হলটির জায়গা এখন অন্য কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শাপলা টকিজের বিদায়ের মধ্য দিয়ে রংপুরে একক পর্দার প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতির এক যুগের অবসান হলো। একসময় এই শহরে শাপলা ছাড়াও ছিল দরদী হল, ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজ, নূর মহল আর চায়না টকিজের মতো একাধিক প্রেক্ষাগৃহ। সময়ের সাথে সাথে একে একে এগুলো হারিয়ে গেছে, শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল শুধু শাপলা টকিজ। এখন সেটিও নেই।
ভৈরবেও হারালো আরেকটি ইতিহাস
একই কাহিনি দেখা গেছে ভৈরবেও। শহরের ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহগুলোর একটি মধুমতি সিনেমা হল জুলাই মাসের শেষদিকে বন্ধ হয়ে যায়, আর বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয় ভাঙার কাজ। হল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান লোকসান আর ঋণের বোঝাই এই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ, বিশেষ করে গত দুই ঈদ মৌসুমে ব্যবসা একেবারেই জমেনি। হলটির শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল সাইফ চন্দনের ‘মালিক’ ছবিটি দিয়ে।
এক সময় ভৈরবে চারটি সিনেমা হল ছিল – ছবিঘর, পলাশ, মধুমতি আর দর্শন। এর মধ্যে ছবিঘর পরে রূপান্তরিত হয় একটি শপিং সেন্টারে, আর পলাশ ভেঙে ফেলা হয় আবাসিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য। মধুমতিও এখন নেই, ফলে সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী শুধু দর্শন হলটিই টিকে আছে ভৈরবের ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ হিসেবে। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়, একটি শহরের সিনেমা-অবকাঠামো কতটা দ্রুত সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।
ময়মনসিংহে ভেঙে পড়ল পুরবী
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ময়মনসিংহের পুরবী সিনেমা হল ভেঙে ফেলা হয়, এরপর শহরে টিকে থাকা একমাত্র প্রেক্ষাগৃহ হয়ে যায় ছায়াবাণী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অল্প পরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পুরবী, আর কয়েক দশক ধরে এটি ছিল ময়মনসিংহের সিনেমা সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক পতনের পরই এটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, একসময় ময়মনসিংহে পাঁচটি সিনেমা হল ছিল – অজন্তা, ছায়াবাণী, আলকা, পুরবী আর সেনা অডিটোরিয়াম। বছরের পর বছর ধরে একে একে এগুলো হারিয়ে গেছে, শেষমেশ টিকে আছে শুধু ছায়াবাণী।
পুরবীর পরিণতি আরেকটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে – যখন কোনো হল আর যথেষ্ট আয় করতে পারে না, তখন সেই জমি সিনেমা প্রদর্শনের চেয়ে পুনঃউন্নয়নের জন্য বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।
বন্ধ মানেই সবসময় শেষ নয়
তবে প্রতিটি বন্ধ হয়ে যাওয়া হল যে চিরতরে বন্ধই থেকে যায়, তা নয়। বগুড়ার মধুবন সিনেপ্লেক্স ছবির অভাবে বেশ কয়েক মাস বন্ধ ছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চে ঈদের আগে শাকিব খান অভিনীত ‘প্রিন্স’ ছবি দিয়ে আবার চালু হওয়ার কথা ছিল।
মধুবনের এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সিনেমা ব্যবসার অনিশ্চয়তাকেই তুলে ধরে। একটি হলের ভবন অক্ষত থাকলেও, পর্যাপ্ত ব্যবসাসফল ছবি না থাকলে সেটি চালানো যায় না। অর্থাৎ মধুবনের ঘটনা সংকটের একটু ভিন্ন দিক দেখায় – এখানে ভবন হারিয়ে যায়নি, বরং পর্দাকে আর্থিকভাবে সচল রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
ঢাকার গীতি আর সঙ্গীতও অন্ধকারে
রাজধানীও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। ঢাকার প্রাচীনতম একক পর্দার হলগুলোর মধ্যে দুটি, গীতি আর সঙ্গীত, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে আবার বন্ধ হয়ে যায়, মানসম্পন্ন বাংলা ছবির অভাব আর কমতে থাকা দর্শক সংখ্যার কারণে।
এই বন্ধ হওয়াকে স্থায়ী নয় বরং অনির্দিষ্টকালের জন্য বলা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে ঈদের সময় হল দুটি আবার চালু করার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও মানসম্পন্ন স্থানীয় ছবির অভাব আর সিনেমা দেখার সংস্কৃতিতে ব্যাপক ভাটার কারণে ব্যবসায়িক লোকসানের মুখে হল দুটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের আগে সেগুলো আবার চালু হয়, কিন্তু বছরের শেষদিকে গিয়ে আবারও বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে – কিছু প্রেক্ষাগৃহ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং ছবি পাওয়া আর দর্শক চাহিদার ওপর নির্ভর করে খোলা-বন্ধের এক চক্রে আটকে আছে।
আসল সমস্যা – ছবির অভাব
এই সব ঘটনার মধ্যে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে – সারা বছর ধরে হল চালানোর মতো যথেষ্ট ছবি নেই। শাপলা টকিজ কর্তৃপক্ষ বলেছে, শুধু ঈদের মুক্তি দিয়ে সারা বছর হল চালানো সম্ভব নয়। গীতি আর সঙ্গীত তাদের বারবার বন্ধ হওয়ার জন্য মানসম্পন্ন বাংলা ছবির অভাব আর দর্শক কমে যাওয়াকে দায়ী করেছে। মধুবনের সাময়িক বন্ধ হওয়ার পেছনেও ছিল একই কারণ – ছবির সংকট।
এখান থেকে তৈরি হয় এক দুষ্টচক্র। দর্শক নিয়মিত না এলে টিকিট বিক্রি কমে যায়। আয় কমে গেলে হল মালিকদের হাতে হল রক্ষণাবেক্ষণ বা আধুনিকায়নের সামর্থ্য থাকে না। আর দুর্বল অবকাঠামো দর্শকদের আরও দূরে সরিয়ে দেয়।
শুধু খালি চেয়ারের গল্প নয়
প্রেক্ষাগৃহের এই পতন শুধু খালি আসনের গল্প নয়। জেলা শহরগুলোর সামাজিক আর সাংস্কৃতিক জীবনের একটি বড় অংশ ছিল এই সিনেমা হলগুলো। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে বিনোদন আর একসাথে বসে ছবি দেখার অভিজ্ঞতা দিত এই জায়গাগুলো। এগুলোর হারিয়ে যাওয়া সেই সব জনপদের সাংস্কৃতিক চেহারাটাই বদলে দিচ্ছে।
রংপুরে শাপলার বিদায়ের মধ্য দিয়ে শহরের একক পর্দার সিনেমা সংস্কৃতির একটি বড় অধ্যায় কার্যত শেষ হয়ে গেছে। ময়মনসিংহে পুরবী ভেঙে ফেলার পর ছায়াবাণীই এখন শহরের একমাত্র ভরসা। ভৈরবে মধুমতি বন্ধ হওয়ার পর শহরে ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা আরও কমে গেছে। আর ঢাকায় গীতি ও সঙ্গীতের বারবার বন্ধ হওয়া প্রমাণ করে, দীর্ঘ ইতিহাস থাকা হলগুলোও কীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
মাল্টিপ্লেক্সই কি সমাধান?
বাংলাদেশের দর্শকরা কিন্তু ছবি দেখা বন্ধ করেননি। কোনো ছবি যদি সত্যিই দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করতে পারে, তাহলে মানুষ এখনও হলে যায়, এটাই বারবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু প্রদর্শনের ধরনটাই পাল্টে যাচ্ছে।
মাল্টিপ্লেক্সগুলো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, উন্নত প্রজেকশন আর শব্দব্যবস্থা, আরামদায়ক আসন আর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা দিচ্ছে দর্শকদের। ঐতিহ্যবাহী একক পর্দার হলগুলোর পক্ষে সেই একই মানে প্রতিযোগিতা করার মতো সামর্থ্য প্রায়ই থাকে না।
তবে এর মানে এই নয় যে একটি মডেল আরেকটিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে। বড় শহরের একটি মাল্টিপ্লেক্স কখনোই জেলা শহরের পাড়া-মহল্লার সিনেমা হলের বিকল্প হতে পারে না। বড় শহরের বাইরে বসবাসকারী অনেক মানুষের জন্য স্থানীয় একটি হলের হারিয়ে যাওয়া মানে বড় পর্দায় ছবি দেখার সেই কয়েকটি সুযোগের একটি হারিয়ে ফেলা।
সারাদেশ জুড়ে সংকুচিত হচ্ছে নেটওয়ার্ক
সাম্প্রতিক এই বন্ধ হয়ে যাওয়াগুলো দেখাচ্ছে, সমস্যাটি শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে আছে সারা দেশজুড়ে। রংপুর হারিয়েছে শাপলা টকিজ। ভৈরব হারিয়েছে মধুমতি। ময়মনসিংহ হারিয়েছে পুরবী। বগুড়ার মধুবন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সবেমাত্র আবার চালু হয়েছে। আর ঢাকার গীতি-সঙ্গীত বারবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।
প্রতিটি ঘটনা আলাদা, কিন্তু একসাথে দেখলে এগুলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসার ওপর চাপা পড়ে থাকা সংকটটাই স্পষ্ট করে তোলে। কোনো হল ভেঙে ফেলা হচ্ছে, কোনোটি রূপান্তরিত হচ্ছে অন্য কোনো স্থাপনায়, কোনোটি সাময়িক বন্ধ থেকে আবার ফিরে আসছে কোনো ব্যবসাসফল ছবির হাত ধরে। আর কোনো কোনোটি স্রেফ চিরতরে থেমে যাচ্ছে।
একক পর্দার প্রেক্ষাগৃহ কি টিকে থাকতে পারবে?
ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলগুলোর টিকে থাকার জন্য শুধু ভবন অক্ষত রাখাই যথেষ্ট নয়। দরকার সারা বছর দর্শক টানার মতো ছবি, টেকসই ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর বদলে যাওয়া দর্শক-প্রত্যাশার সাথে মানানসই অবকাঠামো।
সাম্প্রতিক এই বন্ধ হওয়ার ঘটনাগুলো সমস্যার তীব্রতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। শাপলা টকিজ প্রায় পাঁচ দশক টিকে থাকার পর স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। মধুমতির বন্ধ হওয়া আর্থিক চাপে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী হলের তালিকায় যোগ করেছে আরেকটি নাম। পুরবী ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে, আর মধুবন-গীতি-সঙ্গীতের ঘটনা প্রমাণ করে, ভবন টিকে থাকলেও পর্দা সচল রাখা কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তাই চ্যালেঞ্জটা শুধু সিনেমা হলের ভবন টিকিয়ে রাখা নয়। চ্যালেঞ্জটা হলো, এমন একটি পরিবেশ আবার তৈরি করা, যেখানে মানুষ নিজে থেকেই হলের দরজা দিয়ে ঢুকতে চাইবে, আর সেই সামর্থ্যও তাদের থাকবে।
আপাতত ধরনটা স্পষ্ট – একটি হল বন্ধ হয়, আরেকটি ভেঙে ফেলা হয়, কোনোটি রূপান্তরিত হয় অন্য কিছুতে, আর কোনোটি অন্ধকারে ডুবে থেকে অপেক্ষা করে এমন এক ছবির জন্য, যা দর্শকদের আবার হলমুখী করতে পারবে। আর প্রতিটি পর্দা নিভে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের যৌথ সিনেমা-সংস্কৃতির ইতিহাসেরও একটি অংশ।

