বাংলাদেশের ইন্টারনেট বাজারে নতুন ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে (আইএসপি) ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্যাকেজের সঙ্গে অনলাইন স্ট্রিমিং ও অন্যান্য ডিজিটাল সেবা যুক্ত করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
বর্তমানে ইন্টারনেট সংযোগের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সুবিধা যুক্ত করার প্রবণতা বিশ্বজুড়েই বাড়ছে। গ্রাহকরা এখন শুধু দ্রুতগতির ইন্টারনেট চান না, একই সঙ্গে বিনোদন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং অন্যান্য অনলাইন সুবিধাও একটি সমন্বিত প্যাকেজের মাধ্যমে পেতে আগ্রহী।এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিটিআরসি পৃথক কোনো প্রতিষ্ঠানের আবেদন আলাদাভাবে অনুমোদন না দিয়ে দেশের সব লাইসেন্সপ্রাপ্ত আইএসপির জন্য একটি সাধারণ নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
দেশের দুটি বড় ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রেস অনলাইন লিমিটেড এবং আইসিসি কমিউনিকেশন লিমিটেড তাদের অনুমোদিত ইন্টারনেট প্যাকেজের সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে অনুমোদন চেয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এই আবেদন দুটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হলেও পরে বিটিআরসি বিষয়টিকে বৃহত্তর নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুমোদন দিলে বাজারে অসম পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী জানান, প্রযুক্তির কারণে নতুন সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে গ্রাহকদের সেই সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, নতুন ধরনের সেবা চালুর ক্ষেত্রে কোথায় বাধা রয়েছে তা চিহ্নিত করে তা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। তার মতে, অনলাইন স্ট্রিমিং সেবা তথ্য ও টেলিযোগাযোগ—দুই ক্ষেত্রের সমন্বিত রূপ। তাই বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত না করে গ্রাহকদের জন্য এসব সেবা সহজলভ্য করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য বিটিআরসি একটি আন্তঃবিভাগীয় কমিটি গঠন করেছে। কমিশনের সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস এবং আইন ও লাইসেন্সিং বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে এই কমিটি কাজ করবে।
কমিটি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত কার্যক্রম এবং আয় ভাগাভাগির কাঠামো বিশ্লেষণ করবে।এরপর তারা বিটিআরসির কাছে সুপারিশ জমা দেবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই আইএসপিগুলো কীভাবে ইন্টারনেট প্যাকেজের সঙ্গে ওটিটি ও অন্যান্য ডিজিটাল সেবা যুক্ত করতে পারবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
নীতিমালা অনুমোদন হলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা একটি প্যাকেজের মধ্যেই ইন্টারনেট সংযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।এর ফলে আইএসপিগুলো শুধু ইন্টারনেট বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ডিজিটাল সেবা বাজারেও প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ তৈরি করতে পারবে।এতে গ্রাহকদের জন্য সুবিধা যেমন বাড়তে পারে, তেমনি ইন্টারনেট ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রেস অনলাইন লিমিটেড গত জুনে প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে বিটিআরসির কাছে আবেদন করে।পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি “অরবিট ইন্টারনেট প্যাকেজ” নামে একটি প্রস্তাব জমা দেয়, যেখানে ইন্টারনেট সংযোগের পাশাপাশি ফোনে কথা বলার সুবিধা, অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা এবং দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম যেমন বঙ্গ ও চরকির মতো সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্যাকেজে ইন্টারনেটের গতি ২০ এমবিপিএস থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের প্যাকেজে ৬৫০ এমবিপিএস পর্যন্ত রাখা হয়েছে।২০ এমবিপিএস গতির প্যাকেজের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ টাকা থেকে।এই ধরনের প্যাকেজ চালু হলে গ্রাহকরা আলাদা আলাদা সেবার জন্য আলাদা অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে একটি সমন্বিত প্যাকেজের মাধ্যমে একাধিক সুবিধা নিতে পারবেন।
বিটিআরসি বলছে, মোবাইল অপারেটররা বর্তমানে সরাসরি অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন বান্ডেল অফারের মাধ্যমে অনলাইন কনটেন্ট সেবা দিচ্ছে।একই ধরনের সুযোগ নির্দিষ্ট শর্তের মাধ্যমে আইএসপিদের দেওয়া হলে বাজারে ভারসাম্য তৈরি হবে।এর ফলে একই ধরনের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটর ও আইএসপিদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ ইন্টারনেট সংযোগ এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন ও বিভিন্ন অনলাইন সেবার প্রবেশদ্বার।
বিটিআরসি প্রস্তাবিত কাঠামোতে দেশীয় ও বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা নিয়ম রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে।দেশীয় ওটিটি সেবার ক্ষেত্রে আইএসপিগুলো বিটিআরসির অনুমোদিত ইন্টারনেট স্পিডের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই বান্ডেল সুবিধা দিতে পারবে। তবে এজন্য সংশ্লিষ্ট প্যাকেজের অনুমোদন নিতে হবে।
অন্যদিকে বিদেশি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা অন্যান্য বিদেশি ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য আলাদা অনুমোদন প্রয়োজন হবে।এ ক্ষেত্রে বিটিআরসি কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করবে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে ওই প্রতিষ্ঠানের আইনগত অবস্থান, কর ও রাজস্ব সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা, বিদেশি মুদ্রায় অর্থ পরিশোধের বিষয়, আয় ভাগাভাগির ব্যবস্থা, তথ্য সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক চুক্তি।
শুধু বিনোদনভিত্তিক ওটিটি নয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি এবং অন্যান্য সামাজিক সেবামূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করার ক্ষেত্রেও আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে বিটিআরসি সেবার ধরন, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমতি, তথ্যের গোপনীয়তা, সেবার মান, দায়বদ্ধতা এবং আইএসপি ও সেবা প্রদানকারীর আর্থিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করবে।কারণ স্বাস্থ্য বা শিক্ষা সম্পর্কিত ডিজিটাল সেবায় ব্যবহারকারীর তথ্যের নিরাপত্তা এবং সেবার মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো আইএসপি বিটিআরসির পূর্ব অনুমোদন ছাড়া ইন্টারনেট প্যাকেজের অংশ হিসেবে কোনো ওটিটি বা অন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাজারজাত করতে পারবে না।
দেশীয় ওটিটি সেবা যুক্ত করতে হলে আইএসপিকে সংশ্লিষ্ট সেবার নাম, ধরন, প্যাকেজের বিস্তারিত তথ্য এবং গ্রাহকের জন্য প্রযোজ্য শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট ওটিটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে কনটেন্টের বৈধতা, মেধাস্বত্ব, কপিরাইট, লাইসেন্স এবং দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলার দায় নিতে হবে।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে অনলাইন বিনোদন, ডিজিটাল শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট সেবার সঙ্গে অতিরিক্ত ডিজিটাল সুবিধা যুক্ত করার সুযোগ আইএসপিগুলোর ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে নতুন এই ব্যবস্থা সফল করতে হলে গ্রাহকের স্বার্থ, তথ্য নিরাপত্তা, ন্যায্য মূল্য এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে।
সঠিক নীতিমালা তৈরি করা গেলে এটি শুধু আইএসপি ব্যবসার সম্প্রসারণ নয়, বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

