হলিউডের পর্দায় অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া ম্যাট ডেমন এবার আলোচনায় এসেছেন মানবকল্যাণমূলক একটি উদ্যোগের কারণে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন সুবিধা নিশ্চিত করতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংস্থা ‘ওয়াটার ডট ওআরজি’ কাজ করছে। এই উদ্যোগের অন্যতম ভিত্তি বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্ভাবিত ক্ষুদ্রঋণ পদ্ধতি।
সম্প্রতি কনটেন্ট নির্মাতা টেড ঝারের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে নিজের এই উদ্যোগের সাফল্য ও কার্যক্রমের কথা তুলে ধরেন অস্কারজয়ী অভিনেতা ম্যাট ডেমন। সেখানে তিনি জানান, কেবল দান বা অনুদানের ওপর নির্ভর না করে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে কীভাবে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর কাছে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশনের সুযোগ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
এ সময় বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অবদানের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। ম্যাট ডেমনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
জাম্বিয়া সফর বদলে দেয় ভাবনা
ম্যাট ডেমনের এই মানবকল্যাণমূলক উদ্যোগের পেছনে রয়েছে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ২০০৬ সালে আফ্রিকার জাম্বিয়া সফরে গিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেন, কীভাবে পানির অভাব একটি অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
সেখানে একটি কিশোরীর সঙ্গে পানি সংগ্রহের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন আনে। তিনি উপলব্ধি করেন, অনেক মেয়েকে প্রতিদিন বিশুদ্ধ পানির সন্ধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে তাদের পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং স্বাভাবিক শৈশব মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
যে সময় শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার কিংবা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেই সময়ের বড় অংশই তাদের ব্যয় করতে হয় পানি সংগ্রহের কাজে। বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপরই পানির সংকট মোকাবিলায় কার্যকর কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
যেভাবে গড়ে ওঠে ওয়াটার ডট ওআরজি
জাম্বিয়া সফরের অভিজ্ঞতার পর ম্যাট ডেমন ‘এইচটুও আফ্রিকা’ নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে প্রকৌশলী গ্যারি হোয়াইটের প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়াটার পার্টনারস’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গড়ে তোলেন ‘ওয়াটার ডট ওআরজি’।
সংস্থাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
তবে প্রচলিত দাতব্য কার্যক্রমের বাইরে গিয়ে তাঁরা এমন একটি অর্থায়নব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করেন, যেখানে দরিদ্র পরিবার নিজেরাই প্রয়োজনীয় পানির অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে।
ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ ধারণা যেভাবে কাজে লাগছে
ওয়াটার ডট ওআরজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো ‘ওয়াটার-ক্রেডিট’। এই প্রকল্পের মূল ধারণা বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ম্যাট ডেমন ও তাঁর সহযোগী গ্যারি হোয়াইট গবেষণায় দেখতে পান, দরিদ্র পরিবারগুলো প্রতিদিন পানি সংগ্রহ করতে যে সময় ও অর্থ ব্যয় করে, অনেক ক্ষেত্রে তা নিজেদের বাড়িতে পানির ব্যবস্থা করার জন্য নেওয়া ক্ষুদ্রঋণের কিস্তির চেয়েও বেশি।
এই বাস্তবতা থেকেই তাঁরা বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতির দিকে এগিয়ে যান। বিনা মূল্যে পানি সরবরাহ কিংবা অনুদানের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে স্থানীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে স্বল্প পরিমাণ ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
ঋণের অর্থ ব্যবহার করে পরিবারগুলো নিজেদের বাড়িতে পানির সংযোগ, পানির কল কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার স্থাপন করতে পারে। ফলে পানির সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির সুযোগও পাচ্ছে তারা।
এই ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, পরিবারগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন পায় এবং ধীরে ধীরে কিস্তি পরিশোধ করে। অন্যদিকে স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জীবনে পরিবর্তন
সাক্ষাৎকারে ম্যাট ডেমন জানান, তাঁদের সংস্থা এখন পর্যন্ত ২ কোটি ১০ লাখের বেশি ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করেছে। এসব ঋণের মোট আর্থিক মূল্য ৮০০ কোটি ডলারেরও বেশি।
এই অর্থায়নের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিবারগুলো নিজেদের বাড়িতে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন সুবিধা গড়ে তুলতে পেরেছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওয়াটার ডট ওআরজির কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ পানি ও পয়োনিষ্কাশন সুবিধার আওতায় এসেছে।
বর্তমানে কেনিয়া, তানজানিয়া, উগান্ডা, বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, ব্রাজিল ও মেক্সিকোসহ ১৫টির বেশি দেশে কাজ করছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ মডেলের আন্তর্জাতিক প্রভাব
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ ধারণা দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা দরিদ্র মানুষকে ছোট অঙ্কের ঋণের সুযোগ করে দেওয়া, যাতে তাঁরা নিজেদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেন।
ম্যাট ডেমনের উদ্যোগে সেই ধারণার একটি ভিন্ন প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। এখানে ঋণ শুধু আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে নয়, বরং মানুষের মৌলিক প্রয়োজন—বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণের সম্ভাব্য ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের একটি অর্থনৈতিক ধারণা কীভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধানে কাজে লাগতে পারে, তারও একটি উদাহরণ তৈরি হয়েছে।
ম্যাট ডেমনের এই উদ্যোগের সাফল্য তাই শুধু একজন হলিউড তারকার মানবিক কর্মকাণ্ডের গল্প নয়। এটি এমন একটি ধারণার আন্তর্জাতিক প্রয়োগের চিত্র, যেখানে আর্থিক সহায়তাকে মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

