শুকলাল হাটে আশরাফ আলীর একটি ফলের দোকান আছে, আর সেই দোকানের ঠিক পেছনেই রয়েছে এমন একখণ্ড জমি, যার মালিকানা তাঁর নয়, কিন্তু যার ওপর তিনি এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে দুই ভাগে বিভক্তকারী কংক্রিটের বিভাজক ধরে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে প্রায় ২০০ ফুট জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই জমি।
গত তিন বছর ধরে এই সরকারি জমিই তাঁর পরিবারের খাবারের জোগান দিচ্ছে, মাঝেমধ্যে এনে দিচ্ছে বাড়তি কিছু টাকাও। এই কাজের জন্য কখনো কারও অনুমতি নিতে হয়নি তাঁকে, আর গত তিন বছরে কেউ এ নিয়ে প্রশ্নও তোলেননি।
আশরাফ আলীর ভাষায়, জমিটি একেবারে তাঁদের ঘরের গা ঘেঁষে হওয়ায় এটি তাঁদের জন্য বেশ সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। নিজেদের খাওয়ার জন্য শাকসবজি ফলিয়ে যা উদ্বৃত্ত থাকে, তা বাজারে বিক্রি করে কিছু আয়ও করেন তাঁরা। নিজস্ব জমিজমা না থাকায় বাড়তি কোনো খরচ ছাড়াই এই জায়গাটুকু তাঁদের সংসারের জন্য বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, একটি জাতীয় মহাসড়কের মাঝখানে, বিপরীতমুখী যানবাহনকে সংঘর্ষ থেকে রক্ষা করার জন্য নির্মিত এই বিভাজকের ওপর ফসল ফলানো সম্পূর্ণভাবে বেআইনি একটি কাজ। এই কাজে জড়িত স্থানীয় বাসিন্দা, তা এড়িয়ে যাওয়া স্থানীয় প্রশাসন, কিংবা সড়কের মালিক সরকারি দপ্তর—কারও পক্ষ থেকেই এটি সমর্থনযোগ্য নয়। তা সত্ত্বেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আশরাফ আলীর মতো অনেকেই বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে মিরসরাই পর্যন্ত বিস্তৃত এই দীর্ঘ পথে সড়ক ও জনপথ বিভাগের বহু বছর আগে করা সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের গাছপালা কেটে ফেলে সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি—পালং শাক, লাল শাক, পাট শাক, শিম, বেগুন, ঢ্যাঁড়শ, লাউ-কদু, কাঁচামরিচ, মুলা, মিষ্টি কুমড়া ও ধনেপাতা। কোথাও কোথাও সড়ক বিভাজক থেকেই উঠে গেছে বাঁশের মাচা, যাতে লতানো সবজি বেয়ে উঠতে পারে। দূর থেকে দেখলে দৃশ্যটি প্রায় একখণ্ড শান্ত আবাদি জমির মতোই মনে হয়।
অথচ এই একই সড়কের একটি অংশকে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া প্রায় ৩৭ হাজার দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে একটি সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সংগঠন দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২১টি জোনের একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, যার মধ্যে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই দুটি উপজেলাই রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত আরেকটি পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেড় বছরে দেশের দশটি জাতীয় মহাসড়কে নিবন্ধিত মোট ৬৫৮টি দুর্ঘটনার মধ্যে ২২৮টিই ঘটেছে এই একটি সড়কে—যা অন্য যেকোনো মহাসড়কের চেয়ে বেশি।
পরিকল্পনা কমিশনের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন ৩০ হাজারেরও বেশি যানবাহন চলাচল করে, এবং এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ট্রাক, বাস ও প্রাইভেট কার প্রায়ই দ্রুতগতিতে, গা ঘেঁষে এবং রাতের অন্ধকারেও তীব্র গতিতে চলাচল করে। সামান্য অসতর্কতা বা অপরিকল্পিত আচরণকেও ক্ষমা করার মতো সড়ক এটি নয়। আর এখানেই চাষাবাদের ঝুঁকিটা সবচেয়ে বেশি। কারণ সবজি চাষে পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা কিংবা ফসল তোলার জন্য কাউকে না কাউকে সরাসরি বিভাজকে উপস্থিত থাকতে হয়, ঠিক যে মুহূর্তে পাশ দিয়ে ঘণ্টায় ৬০-৭০ কিলোমিটার গতিতে ভারী ট্রাক ছুটে যায়।
সীতাকুণ্ডের এক বাসিন্দা স্বীকার করেন, বিপদ জেনেও তাঁরা এই কাজ করছেন—বিভাজকের একদম গা ঘেঁষে গাড়ি চলাচল করে, কোনো লরি এলে দ্রুত সরে যেতে হয়, দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবসময়ই থেকে যায়। মিরসরাইয়ের আরেক বাসিন্দাও একই কথা বলেন—তাঁরা জানেন সড়ক বিভাজক ব্যক্তিগত ব্যবহারের জায়গা নয়, বিশেষ করে গাছ কেটে বাঁশের মাচা তৈরি করাটা একেবারেই অনুচিত, তবু বছরের পর বছর তাঁরা এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই সমস্যার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর ব্যাপকতা। সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই—এই দুই উপজেলার অন্তত এক ডজন নির্দিষ্ট এলাকায় এমন চাষাবাদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আইনত যে জমি এভাবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই, সেখানে বছরের পর বছর ধরে একটি অলিখিত নিয়ম গড়ে উঠেছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, সড়ক সম্প্রসারণ বা পরিষেবা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রয়োজনে বিভাগের উদ্বৃত্ত জমি ইজারা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও, মহাসড়কের মধ্যবর্তী বিভাজককে আবাদি জমিতে রূপান্তরিত করার কোনো বিধান নেই। এ বিষয়ে সওজ চট্টগ্রাম সড়ক সার্কেলের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানান, নীতিমালার আওতায় অব্যবহৃত জমি ইজারা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও মূল সড়কের বিভাজক ব্যক্তিগত ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই এবং বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে বলে তিনি জানান, শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দেন।
তবে এমন প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়—সাধারণত কোনো সমস্যা বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত ও জনসমক্ষে আসার পরই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ ধরনের আশ্বাস পাওয়া যায়। চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে সহজে চোখে না পড়লেও, নিরাপত্তার পাশাপাশি এর পরিবেশগত প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সওজ নিছক সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য এই গাছপালা রোপণ করেনি—এসব উদ্ভিদ বাতাস প্রতিরোধ, ধুলিকণা শোষণ, সীমিত মাত্রায় কার্বন শোষণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে রাতে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো প্রতিহত করার কাজ করে।
সেই গাছ কেটে যদি সেখানে এমন মৌসুমি ফসল লাগানো হয় যা কয়েক মাস পরপর কেটে জমি খালি করে ফেলা হয়, তাহলে প্রতিটি চক্রেই এসব সুবিধা হারিয়ে যায়। বর্ষাকালে বিভাজকের খোলা মাটি বৃষ্টিতে দ্রুত ক্ষয়ে গিয়ে মূল সড়কে ভেসে আসে, যা নিজেই আরেকটি বিপদ ডেকে আনে। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে এভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চাষাবাদ চলতে থাকার ঘটনাই প্রমাণ করে, সওজের নিয়মিত তদারকি এই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
এই একই সড়কে দেখা দিয়েছে দ্বিতীয় আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা—অবৈধ পারাপার। চৌদ্দগ্রামের মতো এলাকায় কংক্রিটের বিভাজকের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে, তবে তা চাষাবাদের জন্য নয়, বরং সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে ব্যবহারের জন্য—যাতে সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ও পিকআপ নিকটবর্তী বৈধ ইউ-টার্ন এড়িয়ে সরাসরি মহাসড়ক পার হতে পারে। এই ভাঙন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং বিপরীতমুখী দ্রুতগতির যানবাহন প্রবাহকে আলাদা রাখার জন্য নির্মিত একটি প্রতিবন্ধককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই ফাটল দিয়ে মহাসড়কের চারটি লেন পার হওয়া মানে ইতিমধ্যেই প্রাণঘাতী প্রমাণিত একটি সড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষের সবচেয়ে নিশ্চিত পথ তৈরি করে দেওয়া।
সবজি চাষ এবং অবৈধ পারাপার—এই দুটি সমস্যাকে পাশাপাশি রাখলে একটি স্পষ্ট চিত্রই উঠে আসে: মহাসড়কের বিভাজক আর তার প্রকৃত কাজ করছে না। এটি এখন কোথাও আবাদি জমি, কোথাও অস্থায়ী কাঁচা রাস্তায় পরিণত হয়েছে, আর উভয় ক্ষেত্রেই মানুষকে নিরাপদ রাখার সীমারেখাটি নীরবে মুছে গেছে।
এই সমস্যার সমাধান কেবল আশরাফ আলী বা তাঁর মতো ব্যক্তিদের সতর্ক করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—তাঁরা শুধু তদারকিহীন একখণ্ড জমির সুযোগ নিচ্ছেন মাত্র। প্রকৃত দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিজস্ব নীতিমালাকে কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে প্রয়োগ করা, নিজেদের সম্পদ রক্ষা করা, কাটা গাছের জায়গায় নতুন গাছ রোপণ করা এবং ভেঙে ফেলা অবৈধ পারাপারগুলো বন্ধ করা। জীবিকার সংস্থান করতে গিয়ে কেউ দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে পরিণত হওয়ার আগেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

