প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। এডিস মশাবাহিত এই রোগ এখন আর শুধু মৌসুমি জ্বর নয়, বরং বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যাসংকট এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এমন বাস্তবতায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভ্যাকসিনের আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিনের গবেষণার ফল হিসেবে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর কয়েকটি টিকা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব টিকা ডেঙ্গু সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করতে না পারলেও রোগের জটিলতা, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন এবং মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। ফলে ডেঙ্গু মোকাবিলায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডেঙ্গু ভাইরাস কেন জটিলঃ ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ভিন্ন ধরন বা সেরোটাইপ রয়েছে—ডিইএন-১, ডিইএন-২, ডিইএন-৩ এবং ডিইএন-৪। একজন ব্যক্তি একবার কোনো একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সেই ধরনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। তবে বাকি তিন ধরনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি হয় না। বরং পরে অন্য কোনো সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের মতো গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
এই চার ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধেই সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে টেট্রাভ্যালেন্ট ডেঙ্গু ভ্যাকসিন। বর্তমানে বিশ্বে বহুল আলোচিত দুটি অনুমোদিত ডেঙ্গু টিকার মধ্যে রয়েছে জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাকেদার কিউডেঙ্গা (টিএকে-০০৩) এবং ফ্রান্সভিত্তিক সানোফি পাস্তুরের ডেংভ্যাক্সিয়া। এসব টিকা মানবদেহে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলে ডেঙ্গু সংক্রমণের তীব্রতা কমাতে সহায়তা করে।
ডেঙ্গু টিকা কেন গুরুত্বপূর্ণঃ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মশা নিধন বা ব্যক্তিগত সতর্কতার মাধ্যমে ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই টিকাদান কর্মসূচি ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি কার্যকর সংযোজন হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনুমোদিত ডেঙ্গু টিকা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে গুরুতর রক্তক্ষরণ, শক সিনড্রোম এবং মৃত্যুঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
ডেঙ্গুর মৌসুমে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দ্রুত বেড়ে যায়। শয্যা, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, প্লাটিলেট এবং রক্তের অন্যান্য উপাদানের সংকটও দেখা দেয়। টিকাদানের মাধ্যমে রোগীর সংখ্যা এবং রোগের তীব্রতা কমানো সম্ভব হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর এই অতিরিক্ত চাপও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
ডেঙ্গুতে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রথমবারের তুলনায় বেশি ভয়াবহ হতে পারে। ভিন্ন সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমণের ফলে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। চার ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করায় টিকা এই ঝুঁকিও কমাতে ভূমিকা রাখে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ডেঙ্গু বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং পরিবারের মানসিক চাপ মিলিয়ে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয় পর্যায়েই এর প্রভাব পড়ে। কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে এই ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হতে পারে।
কারা নিতে পারবেন ডেঙ্গু টিকাঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ডেঙ্গু টিকা সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নয়। বয়স এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ভিত্তিতে টিকা ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়।
কিউডেঙ্গা সাধারণত ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের জন্য অনুমোদিত। এই টিকা দেওয়ার আগে ব্যক্তি পূর্বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন কি না, তা পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না।
অন্যদিকে ডেংভ্যাক্সিয়া সাধারণত ৯ থেকে ১৬ বছর অথবা কিছু দেশে ৪৫ বছর পর্যন্ত নির্দিষ্ট বয়সসীমার মানুষের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এই টিকা গ্রহণের আগে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হয় যে ব্যক্তি আগে অন্তত একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, ডেঙ্গু টিকা শতভাগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করে না। তবে এটি রোগের তীব্রতা কমিয়ে গুরুতর জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। অনেকটা করোনা বা ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকার মতোই এর মূল উদ্দেশ্য রোগের ভয়াবহতা কমানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু টিকা কার্যকরভাবে চালু করতে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো টিকার উচ্চ মূল্য এবং সহজলভ্যতা। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব টিকার দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন ব্যয়বহুল হতে পারে।
এ ছাড়া দেশে কোন সেরোটাইপের ডেঙ্গু ভাইরাস বেশি সক্রিয়, তা নিয়মিত বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ ভাইরাসের ধরন অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে ডেঙ্গু টিকা অন্তর্ভুক্ত করা। কোন বয়সী জনগোষ্ঠীকে আগে টিকা দেওয়া হবে, কোন এলাকায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং কীভাবে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু টিকা একটি শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা হলেও এটি একমাত্র সমাধান নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।
তাঁদের মতে, কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা এবং পর্যায়ক্রমে টিকাদান—এই তিনটি উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় টিকাকে নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা হলেও, এর পাশাপাশি সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কৌশলই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

