দেশে হামে মৃত্যুবরণকারী শিশুদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি এমন বয়সেই মারা গেছে, যখন তাদের এই রোগের টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এই তথ্য উঠে এসেছে। এমনকি দুই ডোজ টিকা সম্পূর্ণ নেওয়ার পরও কিছু শিশুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হামের সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমে এলেও জাতীয় টিকা কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও তা প্রাদুর্ভাব-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে আসেনি।
চলতি আগস্ট মাসের শুরুর দিক পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক রোগতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের সার্বিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে দেশীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে প্রায় আটশ, আর নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে প্রায় একশ শিশুর—সব মিলিয়ে এ বছর হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় নয়শর কাছাকাছি। দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে হামে এত মৃত্যুর নজির নেই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এপ্রিলের শুরুতে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর মে মাসের শেষে জাতীয় ক্যাম্পেইন সম্পন্ন হলেও, তারপর শিশুদের শরীরে হাম প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা তৈরি হয়েছে—তা যাচাইয়ের কোনো উদ্যোগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের মার্চের শুরু থেকে দেশের কয়েকটি জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে দ্রুতই তা দেশের সব জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত মৃত্যুর তথ্য জানিয়ে এলেও, সংক্রমণ শুরুর ছয় মাস পার হওয়ার পরও কোন বয়সীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, কাদের মৃত্যুহার বেশি, আক্রান্ত বা মৃতদের মধ্যে টিকা নেওয়ার হার কেমন—এসব বিস্তারিত তথ্য জনসাধারণ বা গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামে মৃতদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের বয়স ছিল ছয় মাসের কম, আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ছিল ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে। অর্থাৎ মোট মৃতদের অর্ধেকের বেশি ছিল নয় মাস বয়সের নিচে—যাদের কারওরই টিকা নেওয়ার বয়স তখনো হয়নি।
সংস্থাটির তথ্য আরও বলছে, মৃতদের নব্বই শতাংশই হামের কোনো টিকা পায়নি। মৃতদের প্রায় আট শতাংশ এক ডোজ টিকা পেয়েছিল, আর দুই শতাংশের বেশি দুই ডোজ সম্পূর্ণ করার পরও মারা গেছে। উল্লেখ্য, হামের টিকার প্রথম ডোজ সাধারণত দেওয়া হয় নয় মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ পনেরো মাস বয়সে। এ ছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি—প্রায় চুরানব্বই শতাংশ—মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
মোট প্রায় তিপ্পান্ন হাজারের বেশি হাম আক্রান্তের তথ্য বয়সভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যার মধ্যে একটি বড় অংশের তথ্য নেওয়া হয়েছে জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইন শুরুর আগে এবং বাকিটা ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরে। ক্যাম্পেইনটি এপ্রিলের শেষভাগে শুরু হয়ে মে মাসের শেষে সম্পন্ন হয়।
ক্যাম্পেইন শুরুর আগে দেখা গেছে, আক্রান্তদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম ছিল, আর প্রায় সতেরো শতাংশের বয়স ছিল পাঁচ থেকে চৌদ্দ বছরের মধ্যে। তবে পনেরো বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে। ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সীদের অনুপাত কিছুটা কমে এসেছে, যদিও তা এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, নবজাতক ও অতি অল্পবয়সী শিশুরা মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডির কারণে হাম থেকে সুরক্ষিত থাকে, আর এ কারণেই তাদের প্রাথমিক পর্যায়ে টিকা দেওয়া হয় না। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, আক্রান্তদের এক-দশমাংশ এবং মৃতদের এক-পঞ্চমাংশের বয়সই ছিল ছয় মাসের কম—যা প্রচলিত এই ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের ন্যূনতম বয়সসীমা নয় মাস থেকে সাময়িকভাবে ছয় মাসে নামিয়ে আনা হলেও বাস্তবে এর তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি বলে তথ্য-উপাত্ত থেকে স্পষ্ট।
একজন জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক বলেন, নয় মাস কিংবা তারও কম বয়সী, এমনকি একেবারে নবজাতকদের মধ্যেও হাম দেখা যাওয়ার অর্থ হলো, মায়ের শরীর থেকে যথাযথ অ্যান্টিবডি শিশুর শরীরে সঞ্চারিত হচ্ছে না। এই ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বিস্তারিত গবেষণা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, মায়েদের কাছ থেকে শিশুরা প্রকৃতপক্ষে কতটা প্রতিরোধ ক্ষমতা পাচ্ছে, কোন বয়স থেকে টিকাদান শুরু করা উচিত, এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদেরও টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন কি না—এসব বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক একটি জাতীয় নীতিগত অবস্থানপত্র তৈরি হওয়া জরুরি। দ্রুত এই সিদ্ধান্তগুলো না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর সংকটের দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

