বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার তুলনায় বাংলাদেশের তালিকা অনেকটাই সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পাঁচশ তেইশটি এবং শিশুদের জন্য প্রায় তিনশ চুয়াত্তরটি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় জায়গা পেয়েছে মাত্র একশ সতেরোটি ওষুধ। অথচ নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দুই বছর অন্তর এই তালিকা হালনাগাদ করার কথা থাকলেও বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে করা হয়নি বলে জানা গেছে।
আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে ‘রোগীর নাগালে ওষুধ, উৎপাদকের টেকসইতা: ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক একটি জাতীয় নীতি সংলাপে এসব তথ্য ও পর্যবেক্ষণ উঠে আসে।
সংলাপে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদের পাশাপাশি রোগীদের নাগালে ওষুধের প্রকৃত প্রাপ্যতা, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং ওষুধের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর নীতি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকা জরুরি। একইসঙ্গে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করা এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপরও জোর দেন তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে শুধু তালিকা তৈরি করলেই যে মানুষের ওষুধ প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে, তা নয়। দেশের সব অঞ্চলে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আছে কি না এবং নিরাপদভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে কি না— এসব বিষয়ও নিশ্চিত করা সমানভাবে জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছর তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকার চৌত্রিশতম সংস্করণ হালনাগাদ করেছে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পাঁচশ তেইশটি এবং শিশুদের জন্য প্রায় তিনশ চুয়াত্তরটি প্রয়োজনীয় ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
একটি টেকসই ওষুধনীতি গড়ে তুলতে তিনটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি— ওষুধের প্রাপ্যতা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং ওষুধের নিরাপত্তা। তার পর্যবেক্ষণ, অনেক সময় বাজারে ওষুধ থাকা সত্ত্বেও দুর্বল মজুত ব্যবস্থাপনা, নকল বা নিম্নমানের ওষুধের উপস্থিতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নানা জটিলতার কারণে রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত থেকে যান।
ওষুধের নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করতে দেশের ড্রাগ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি ওষুধ সেবনজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং নকল-নিম্নমানের ওষুধ শনাক্তে একটি শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তিসংগত ওষুধ ব্যবহারের কথা আলোচিত হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ এখনো দুর্বল বলে মন্তব্য করে তিনি সতর্ক করেন, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণু-প্রতিরোধ ক্ষমতা ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিকসহ সব ধরনের ওষুধ যুক্তিসংগতভাবে ব্যবহারের বিষয়টি এখনই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সংলাপে উপস্থিত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জানান, দুই হাজার তেইশ সালের ঔষধ ও কসমেটিকস আইনের একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী প্রতি দুই বছর অন্তর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদের কথা থাকলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হয়নি। আইন অনুযায়ী একটি জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও তা না করে বরং উপদেষ্টা পরিষদ ছাড়াই একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যা নিয়ে বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, হাইকোর্টের আগের একটি রায় অনুযায়ী ওষুধের প্রাপ্যতা সংবিধানে উল্লেখিত জীবনের অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সাতশ ঊনচল্লিশটি ওষুধের একটি তালিকা কমিয়ে একশ সতেরোটিতে নামিয়ে আনা এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন টাস্কফোর্স বা কমিটির মাধ্যমে তালিকা পরিবর্তন বা বাতিল করার বিষয়টি হাইকোর্টের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সাংবিধানিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, জীবনরক্ষাকারী ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নে মুনাফা অর্জনের চেয়ে জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবনের অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট রায় এবং সাতশ ঊনচল্লিশটি ওষুধের মূল তালিকা বহাল না রেখে হঠাৎ কোনো টাস্কফোর্স বা উপদেষ্টা পরিষদের মাধ্যমে তালিকা বাতিল বা পরিবর্তন করা আইনসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংলাপে অংশ নেওয়া একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, চলতি বছরের এসেনশিয়াল মেডিসিন তালিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করে প্রণয়ন করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি উদ্বেগজনক বিষয়। তার মতে, ওষুধ কোম্পানিগুলোর স্বার্থের সংঘাত এড়াতে তালিকা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকলেও সামগ্রিক নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ ওষুধের দামও সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে রাখতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির চাপ এবং আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব নীতির কারণে যাতে দেশীয় ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে দিকেও বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
সরকারি মালিকানাধীন ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, সরকারি উদ্যোগে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ উৎপাদন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেমন একটি ভ্যাকসিন উৎপাদন কারখানা, রাজনৈতিক কারণে বন্ধ না রেখে তা পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও যোগ করেন, করোনা মহামারি-পরবর্তী সময়ে দেশের ওষুধ ও ভ্যাকসিন খাতকে সত্যিকার অর্থে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে হলে বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মুক্তবাজারের অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য সরকারের ওষুধনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিষয়ক একটি ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক। তিনি বলেন, রোগীর জন্য ওষুধ সাশ্রয়ী রাখা এবং ওষুধশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা নিশ্চিত করা— এই দুটি লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একই জনস্বাস্থ্যনীতির দুটি অপরিহার্য দিক। তার মতে, ওষুধনীতির প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় সর্বনিম্ন সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করা, বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি টেকসই ও যুক্তিসংগত মূল্য নির্ধারণ, যা একদিকে রোগী বহন করতে পারেন, অন্যদিকে উৎপাদকরাও মানসম্মত ওষুধ টেকসইভাবে উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেন।

