দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সব হাসপাতালকে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বিশেষ করে রাজধানীর হাসপাতালগুলোকে এ ক্ষেত্রে বাড়তি গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। রোগীর চাপ সামলাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি ফিল্ড হাসপাতাল চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য জায়গা বের করতে সেখানকার বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে অন্যত্র সরানোর কথাও ভাবা হচ্ছে।
রোববার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে। কর্মকর্তারা জানান, সভার পরই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। ক্যানসার চিকিৎসা নিয়ে আয়োজিত একটি বৈঠকের ফাঁকেই এই আলোচনা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে একদিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। এ নিয়ে এ বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৭১ জনে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫৯ জন বেশি।
একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯০২ জন রোগী। ফলে চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ৮৮ হাজার ৩৮০ জনে। গত বছর এ সময় পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যার চেয়ে এটি ৩৮ হাজার ৪৫৩ জন বেশি। অর্থাৎ সংক্রমণের মাত্রা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে চড়া।
চলতি বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস ছিল সেপ্টেম্বর। এ মাসে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৯৩ জন। একই মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন, দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৪৫৯ জন। মৃত্যু ও শনাক্ত, দুই ক্ষেত্রেই সেপ্টেম্বরের সংখ্যা বছরের প্রথম আট মাসের মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি। এ থেকে স্পষ্ট, বছরের শেষ দিকে এসে সংক্রমণ হঠাৎ করে অনেকখানি বেড়েছে।
অক্টোবরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। মাসের প্রথম কয়েক দিনেই ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৮ হাজার ৭৪০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এতে সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাবে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ৭৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী।
সমস্যা শুধু ডেঙ্গুতেই সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে হামের রোগীও বাড়ছে। মে মাসের পর সেপ্টেম্বরেই হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি হাম রোগী শনাক্ত ও ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাম রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ১৯৮। দুই রোগের চাপ একসঙ্গে পড়ায় হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল বিভাগের পরিচালক নুরুল ইসলাম জানান, সভায় শয্যা বাড়ানোর নানা উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে জায়গা থাকলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগীকে সেখানে পাঠানো যেতে পারে। এতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বাড়তি কিছু শয্যা পাওয়া যাবে।
তবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে জটিলতা আছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। কীভাবে এগোনো হবে, তা ঠিক করতে সোমবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বসবে। তিনি জানান, হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। নির্ধারিত জায়গায় কুলাচ্ছে না বলে বিভিন্ন ওয়ার্ডেও রোগী রাখতে হচ্ছে। আগে স্থাপন করা ফিল্ড হাসপাতালটি চালুর কথাও তাঁরা ভাবছেন।
হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, বর্তমানে দ্বিতীয় ভবনের তিনটি তলা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ রোগী থাকছেন। হাসপাতালটিতে ৩০০ শয্যার একটি বার্ন ইউনিটও আছে।
অন্যদিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাসির উদ্দিন রোববার সন্ধ্যায় জানান, এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তাঁর প্রতিষ্ঠানের শয্যাও রোগীতে ভরা। ফলে বার্ন ইউনিটের রোগী স্থানান্তরের প্রস্তাব বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
অন্যান্য সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ডেঙ্গু রোগীর জন্য শয্যা আরও বাড়াতে বলা হয়েছে। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিবর্তে কুর্মিটোলা মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালকে রাজধানীর বাইরে থেকে আসা ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে বলা হয়েছে। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোকেও শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংকটের সময়েও সরকারি হাসপাতাল রোগী ফিরিয়ে দেয় না। তবে রোগীর সংখ্যা শয্যা সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে রোগীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। সেই ভোগান্তি কমাতেই ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোকেও প্রস্তুত রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকেরাও মনে করেন, রাজধানীর হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো জরুরি। তাঁদের মতে, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে বহু রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায় রেফারেল ছাড়াই ঢাকায় চলে আসেন। এতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় ভিড় আরও বাড়ে।
এর পেছনে স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা। চিকিৎসকদের ভাষ্য, জেলা ও উপজেলার অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ নেই। অন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা এবং চিকিৎসকেরও ঘাটতি আছে। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, শুধু শয্যা বাড়িয়ে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে সামলানো কঠিন হবে। স্থানীয় পর্যায়ের হাসপাতালে আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে ঢাকার ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি রোগের প্রকোপ কমাতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও জোরদার করা প্রয়োজন।

