দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের একদিনের সর্বোচ্চ। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৯৬ জন রোগী। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২৮১ জনে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে সিটি কর্পোরেশনের বাইরে ৪৮০ জন, খুলনা বিভাগে ৩০২ জন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২৯৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৫২ জন, বরিশাল বিভাগে ২০৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৯৯ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১৮৭ জন রয়েছেন। এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৬ জন, রংপুর বিভাগে ৭৫ জন এবং সিলেট বিভাগে ১৮ জন ভর্তি হয়েছেন। এই হিসাবে রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৪৮১ জন। আর ঢাকার বাইরের বিভাগগুলোর মধ্যে খুলনা ও চট্টগ্রামে রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি। অর্থাৎ সংক্রমণ এখন শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই, সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৯০ হাজার ৩৫৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৮৪ হাজার ২৯৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৯৬৪ জন, যা একই সময়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যার প্রায় সমান। ফলে হাসপাতালে রোগীর চাপ কমার তেমন লক্ষণ নেই।
মৃত্যুর হিসাবেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে। এক দিন আগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে মৃতের সংখ্যা ছিল ২৭১ জন, আর এক দিনের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ২৮১ জন। অর্থাৎ মাত্র একদিনেই ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর আগে একদিনের সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ৯ জন, এবার সেই রেকর্ডও ভেঙেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে আগের কয়েক বছরের চিত্রও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে সারা বছরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রকোপ দেখা যায়। সে বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন।
এই হিসাব পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, চলতি বছরের ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং আগের দুই বছরের মোট সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বছরের এখনো প্রায় তিন মাস বাকি। সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে, আর গত দুই মাসে সংক্রমণ যে হারে বেড়েছে, তাতে ২০২৫ সালের মোট আক্রান্তের সংখ্যা এ বছর ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যা এখনো আগের তিন বছরের তুলনায় কম। ২০২৩ সালের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি, তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বগতির বড় কারণ এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি। বর্ষা-পরবর্তী সময়ে জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার বাড়ে। এ অবস্থায় সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান, বাড়ি ও নির্মাণস্থলে জমা পানি পরিষ্কার এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি জ্বর হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজে নিজে ওষুধ না খাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করছেন চিকিৎসকেরা।
হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ সামলানোর জন্য সরকার ইতিমধ্যে শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে শুধু শয্যা বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে। সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে আগামী সপ্তাহগুলোতেও মৃত্যু ও ভর্তির সংখ্যা উচ্চ পর্যায়েই থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

