লিভারের অবস্থা নির্ণয়ের পরীক্ষা ফাইব্রোস্ক্যানের ক্ষেত্রে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেডের সঙ্গে সব ধরনের সেবা-সম্পর্ক ছিন্ন করেছে কেএনএস কানাডা (বিডি)। শুক্রবার থেকেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, পপুলারের কয়েকটি শাখায় অননুমোদিত মেশিন ব্যবহার, যন্ত্রের যথাযথ ক্যালিব্রেশন না করা এবং সনদবিহীন অপারেটর দিয়ে পরীক্ষা চালানোর তথ্য তাদের হাতে এসেছে। তবে দেশের অন্য সব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ফাইব্রোস্ক্যান সেবা আগের মতোই চলবে।
কেএনএস কানাডা (বিডি) এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির কাছে থাকা তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে পপুলারের বেশ কয়েকটি শাখায় নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে অনুমোদনহীন ফাইব্রোস্ক্যান যন্ত্রের ব্যবহার, পরিমাপক যন্ত্রের মান যথাযথভাবে নির্ধারণ না করা এবং প্রশিক্ষণ বা সনদ নেই এমন ব্যক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনা।
ফাইব্রোস্ক্যান আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে লিভারের কাঠিন্য ও ক্ষতির মাত্রা মাপা হয়, যা চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় সহায়তা করে। তবে পরীক্ষার ফল নির্ভরযোগ্য হতে হলে কয়েকটি শর্ত পূরণ জরুরি। যন্ত্রটি অনুমোদিত হতে হবে, প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা থাকতে হবে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যালিব্রেশন করতে হবে এবং পরীক্ষা পরিচালনায় থাকতে হবে প্রশিক্ষিত ও যোগ্য অপারেটর। এর কোনোটিতে ঘাটতি থাকলে ফলাফল বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
কেএনএস কানাডা জানিয়েছে, বাংলাদেশে ফাইব্রোস্ক্যান প্রযুক্তির একমাত্র অনুমোদিত ও এক্সক্লুসিভ পরিবেশক হিসেবে তারা ২০০৮ সাল থেকে এই খাতে কাজ করছে। যন্ত্রটির প্রস্তুতকারক ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান ইকোসেন্সের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রযুক্তিগত মান ও পেশাগত সুনাম ধরে রাখাকে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় বলে দাবি করেছে। পরীক্ষার মান ও কারিগরি মানদণ্ড নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় পপুলারের সঙ্গে সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিদ্ধান্তের ফলে কী পরিবর্তন আসছে, তাও বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে। শুক্রবার থেকে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেসব ফাইব্রোস্ক্যান পরীক্ষা হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কেএনএস কানাডার কোনো অনুমোদন, কারিগরি তত্ত্বাবধান বা সেবাসংক্রান্ত সহায়তা থাকবে না। একই সঙ্গে পপুলারের মাধ্যমে করা পরীক্ষার রিপোর্টে কোনো ত্রুটি, অসংগতি বা কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে তার দায় নেবে না কেএনএস কানাডা (বিডি) ও ইকোসেন্স। অর্থাৎ ওই প্রতিষ্ঠানে করা পরীক্ষার ফলাফলের দায়ভার পুরোপুরি পপুলারের ওপরই বর্তাবে।
রোগীদের নিরাপত্তা ও পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতার কথা বিবেচনা করে কেএনএস কানাডা সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। চিকিৎসক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও সেবাগ্রহীতাদের প্রতি অনুরোধ, ফাইব্রোস্ক্যান পরীক্ষা করানোর আগে তাঁরা যেন তিনটি বিষয় যাচাই করে নেন। প্রথমত, ব্যবহৃত যন্ত্রটি অনুমোদিত কি না। দ্বিতীয়ত, যন্ত্রের প্রোবের ক্যালিব্রেশন যথাযথ হয়েছে কি না। তৃতীয়ত, পরীক্ষা যিনি পরিচালনা করছেন, তাঁর প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা আছে কি না।
এই ঘটনা দেশের ডায়াগনস্টিক খাতে যন্ত্র ও জনবলের মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আবার সামনে এনেছে। লিভারের রোগ অনেক সময় নীরবে বাড়ে। ফাইব্রোস্ক্যানের মতো পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসক ঠিক করেন, রোগীর আরও পরীক্ষা বা ওষুধ দরকার কি না। ভুল বা অনির্ভরযোগ্য ফল পেলে রোগ ধরা পড়তে দেরি হতে পারে, অথবা অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা ও খরচ বাড়তে পারে। তাই যন্ত্রের মান ও অপারেটরের দক্ষতা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, সরাসরি রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে জড়িত।
তবে এখন পর্যন্ত অভিযোগগুলো কেএনএস কানাডার বিজ্ঞপ্তির বরাতেই প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কাছে থাকা তথ্য ও নথির কথা বলেছে, কিন্তু সেসব নথির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। অভিযোগের বিষয়ে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বক্তব্য এই বিজ্ঞপ্তিতে নেই। অভিযোগ কতটা সঠিক, কয়টি শাখায় এমন অনিয়ম হয়েছে এবং রোগীদের রিপোর্টে এর কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে পপুলারের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।
পপুলারে ফাইব্রোস্ক্যান করিয়েছেন বা করানোর পরিকল্পনা করছেন, এমন রোগীরা এখন কী করবেন, সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে আলাদা কোনো নির্দেশনা নেই। তবে প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ পরামর্শ অনুযায়ী, কোনো সংশয় থাকলে নিজের চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনে পরীক্ষা পুনরায় করিয়ে নেওয়া যেতে পারে। দেশের অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এই সেবা অব্যাহত থাকায় বিকল্প খুঁজে নিতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
কেএনএস কানাডার এই পদক্ষেপ একটি বার্তাও দিচ্ছে। চিকিৎসা প্রযুক্তি বিক্রি করলেই দায় শেষ হয় না, ব্যবহারের মান নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। আবার সেবাগ্রহীতাদের জন্যও এটি একটি সতর্কসংকেত। স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর আগে কেবল খরচ বা সুবিধার দিকে নজর না দিয়ে যন্ত্র ও জনবলের যোগ্যতা সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়া জরুরি।

