হামের টিকা পাওয়ার পরও দেশের বড় একটি অংশ শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠেনি, এমন তথ্য উঠে এসেছে একটি নতুন গবেষণায়। জাতীয় হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইনের পর পরীক্ষা করা শিশুদের প্রায় ২৭ শতাংশের রক্তে হামের অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি।
গবেষণার ফল প্রকাশ্যে আসার পর টিকার কার্যকারিতা ও দেশের টিকাদান ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরো ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, এই গবেষণা খুবই ছোট পরিসরের, তাই এর ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক এবং ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের মোট ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা এতে যুক্ত ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, হাম-রুবেলার জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইনের পর পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হাম প্রতিরোধের প্রকৃত অবস্থা জানতে দেশে এমন গবেষণা এই প্রথম।
এ বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত সারা দেশে বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন চালায় স্বাস্থ্য বিভাগ। এতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ক্যাম্পেইন চলাকালে স্বাস্থ্য বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছিলেন, তা শেষ হওয়ার তিন-চার সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাস্তবে ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পরও হামের বিস্তার থামেনি। এ পরিস্থিতিতেই টিকা শিশুদের শরীরে কতটা সুরক্ষা তৈরি করছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরাও এ নিয়ে একটি গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছিলেন।
গবেষণাটি হয় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে, অর্থাৎ ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার ছয়টি উপশহর ও গ্রামাঞ্চল থেকে ৯ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩০৯টি শিশুকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয় টিকা কার্ড দেখে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে। এরপর তাদের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয় আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরিতে।
ফলাফলে দেখা যায়, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ২০৩টির শরীরে হামের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, যা মোট নমুনার ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। আরও ২১টি শিশুর, অর্থাৎ ৬ দশমিক ৮ শতাংশের ফল সীমারেখার কাছাকাছি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, এটি যেমন নিশ্চিত করে বলা যায় না, তেমনি তৈরি হয়নি, সেটিও বলা যায় না। বাকি ৮৫টি শিশুর শরীরে কোনো অ্যান্টিবডিই পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। সীমারেখার কাছাকাছি থাকা শিশুদেরও হিসাবে ধরলে সুরক্ষাহীন বা অনিশ্চিত সুরক্ষার শিশুর অনুপাত প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছায়।
বয়সভেদেও পার্থক্য স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সীদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠার হার বেশি। গবেষকেরা আরও বলছেন, এক ডোজ টিকার চেয়ে দুই বা তিন ডোজে সুরক্ষা বেশি তৈরি হয়। কিন্তু সংক্রমণের বিস্তার থামাতে সমাজে যে মাত্রার সামগ্রিক প্রতিরোধ দরকার, শিশুদের মধ্যে তার চেয়ে অনেক কম সুরক্ষা দেখা যাচ্ছে।
এখানেই বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়। টিকাবিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়সের ওপর কিছুটা নির্ভর করে। ছয় মাস বয়সে টিকা দিলে প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৫০ জনের শরীরে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। নয় মাসে এই সংখ্যা প্রায় ৮৫, আর ১২ মাসে প্রায় ৯০। সে হিসাবে গবেষণায় পাওয়া ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ হার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এই গবেষণায় শিশুদের টিকা নেওয়ার সময়ের বয়স, ডোজের সংখ্যা ও পরীক্ষার সময়ের ব্যবধানের মতো বিষয়গুলো ফলাফলকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। প্রকাশিত তথ্যে এসব বিষয়ের বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাওয়া যায়নি।
কারণ খুঁজতে গিয়ে টিকা-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো একটি কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) যেসব টিকা ব্যবহার হয়, সেগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত। দেশে এসব টিকার মান আলাদাভাবে যাচাই করার কোনো ব্যবস্থা নেই। ধরে নেওয়া হয়, টিকার মানে কোনো ঘাটতি নেই।
টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারি বলেন, একাধিক কারণে টিকার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। টিকাকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করতে হয়। উৎপাদন থেকে শিশুর কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ। এর যেকোনো ধাপে তাপমাত্রার হেরফের হলে টিকার মান নষ্ট হতে পারে। তিনি আরও জানান, শিশু মারাত্মক অপুষ্টির শিকার হলে টিকা কম কার্যকর হয়, আর মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুর ক্ষেত্রে হামের টিকা তুলনামূলক ভালো কাজ করে। তাঁর মতে, ঠিক কোন কারণে টিকা কার্যকর হচ্ছে না, তা অনুসন্ধান করা জরুরি।
গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে ৭০ জন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল। তাদের পর্যালোচনায় বলা হয়, ইপিআইয়ের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ছে। এই তথ্যের সঙ্গে নতুন গবেষণার ফল মিলিয়ে দেখলে চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক হয়। একদিকে একটি বড় অংশ শিশু টিকার আওতাতেই আসছে না, অন্যদিকে যারা টিকা পাচ্ছে, তাদেরও একটি অংশ পুরো সুরক্ষা পাচ্ছে না। দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বাড়ছে।
ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, টিকার বিষয়ে অন্ধ থাকা উচিত নয় এবং শিশুদের বিশুদ্ধ টিকা দিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ পেরিয়ে টিকা শেষ পর্যন্ত শিশুর কাছে পৌঁছায়। এই পুরো যাত্রায় কার্যকারিতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা চেয়েছিলেন।
তবে নতুন গবেষণা নিয়ে সোমবার প্রথম আলোর কাছে ভিন্ন সুর শোনা গেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কণ্ঠে। তিনি বলেন, টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই, কারণ বহু দেশেই এই টিকা ব্যবহার হচ্ছে। গবেষণা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, এটি খুব ছোট পরিসরের এবং নমুনার সংখ্যাও কম। তাই এর ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না, আরও বড় গবেষণা দরকার। মন্ত্রীর এই বক্তব্যে একটি যুক্তিসংগত দিক আছে। মাত্র ৩০৯ শিশুর নমুনা দিয়ে সারা দেশের চিত্র নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। আবার গবেষণাটি তিন জেলার সীমিত এলাকায় হয়েছে, ফলে দেশের অন্য অঞ্চলে ফল ভিন্ন হতে পারে। তবু এত বড় একটি অনুপাত অ্যান্টিবডিহীন পাওয়া গেলে বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগও কম, বিশেষ করে যখন দেশে হামের সংক্রমণ এখনো চলছে।
এ বিষয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা চলছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি। তাঁর ভাষ্য, তিন হাজার শিশুর নমুনা নিয়ে এই গবেষণা হচ্ছে। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ জন করে শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এর ফল প্রকাশ করা হবে। ফলে প্রথম গবেষণার ফল সঠিক ছিল কি না এবং টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রকৃত চিত্র কী, তা অনেকটাই স্পষ্ট হবে এই বড় গবেষণার পর।
এদিকে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু থামছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সোমবারের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এ সময়ে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ছয়জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন। এ বছর হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ২৩৩। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে, আর ১০৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামে। সোমবার সকালে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১১ মাস বয়সী শিশু তিথির মৃত্যু হয়েছে। ছোট্ট এই শিশুটির মরদেহ কোলে নিয়ে হাসপাতাল ছাড়েন তার খালা নীলা।
এই পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশের ওপরে নিতে হবে। তাঁর মতে, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না, এটি এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিনি টিকা দেওয়ার বয়সসীমা বাড়ানোর পক্ষে মত দেন। পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনা দরকার, আর ধাপে ধাপে তা ১৮ বছর পর্যন্ত নিতে হবে। প্রতি চার বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। তাঁর সতর্কবার্তা, বড় পরিকল্পনা না নিলে হামের এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।
আইইডিসিআরের গবেষণা অনুযায়ী টিকা পাওয়ার পরও ২৭ শতাংশ শিশুর শরীরে প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। এর অর্থ, বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এসব শিশুর বয়স বাড়ছে, ফলে তারা ধীরে ধীরে টিকার আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এই ঝুঁকি দূর করতে হলে টিকার মান, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা এবং টিকা দেওয়ার সময়সূচি, সবকিছুই নতুন করে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নভেম্বরের শেষে প্রকাশিতব্য বড় গবেষণার ফল এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

