দেশে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ব্যয়ের চাপ এতটাই বেড়েছে যে ২০২২ সালেই প্রায় ৭২ লাখ মানুষ চিকিৎসার খরচের কারণে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। একই বছরে প্রায় ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক চাপে পড়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটি পরিচালনায় সহায়তা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সুইডিশ দূতাবাস। বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৫, ২০১০, ২০১৬ ও ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের দারিদ্র্যের হার কমলেও চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে গিয়ে মানুষের আর্থিক চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য চিকিৎসার খরচ বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই চাপ শুধু দরিদ্র মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মধ্যবিত্ত ও উচ্চ আয়ের পরিবারও এর বাইরে নেই।
আয় বাড়লেও চিকিৎসার ব্যয় আরও দ্রুত বেড়েছে
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক চাপে ছিলেন ২৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৭ শতাংশে।
অন্যদিকে, ২০০৫ সালে আর্থিক কষ্টে থাকা মানুষের হার ছিল ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, মানুষের আয় বাড়লেও চিকিৎসার ব্যয় তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে খানার আয় বেড়েছে ৩৮ শতাংশ, অথচ একই সময়ে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বেড়েছে ৪৩ শতাংশ।
ফলে অনেক পরিবারকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, ঋণ নিতে হচ্ছে কিংবা জমি ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত পরিবারের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও বেশি।
নিজের পকেট থেকেই যাচ্ছে চিকিৎসার বড় অংশ
বাংলাদেশে চিকিৎসার খরচের বড় অংশ মানুষকে নিজের আয় থেকে বহন করতে হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার জন্য পরিবারের নিজস্ব ব্যয় ক্রমেই বেড়েছে।
২০০৫ সালে চিকিৎসার পেছনে একটি পরিবারের গড় নিজস্ব ব্যয় ছিল ৭০৯ টাকা। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৯৩ টাকায়।
চিকিৎসার ব্যয়ের বড় অংশ চলে যায় ওষুধ কেনা ও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষায়। ২০২২ সালের হিসাবে, বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশ ওষুধের পেছনে খরচ হয়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রেও ওষুধের ব্যয় মোট নিজস্ব খরচের প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এ ছাড়া রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষায় বহির্বিভাগের রোগীদের নিজস্ব ব্যয়ের ১১ শতাংশ এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ব্যয়ের ২২ শতাংশ খরচ হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ, হাসপাতালে থাকা ও যাতায়াতের ব্যয়ও পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা আরও ব্যয়বহুল
গবেষণায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া একজন রোগীর নিজের পকেট থেকে গড় ব্যয় ছিল ১ হাজার ৬৮৮ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে একই ধরনের গড় ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৮০৮ টাকা।
হাসপাতালে ভর্তি হলে ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়ে। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি একজন রোগীর গড় নিজস্ব ব্যয় ছিল ২০ হাজার ৫৪৭ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৫১৭ টাকা। আর বেসরকারি নয়, বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগীর গড় ব্যয় ছিল ২২ হাজার ২৮ টাকা।
এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে অনেক পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হলে পরিবারের সঞ্চয় ও নিয়মিত আয়ের ওপর বড় চাপ পড়ে।
সরকারি হাসপাতালে রোগী যাওয়ার হার কমছে
গবেষণায় চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের পছন্দেও পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০১৬ সালে চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতাল বেছে নিয়েছিলেন ১৫ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ। ২০২২ সালে এই হার কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশে।
অন্যদিকে, ফার্মেসি থেকে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ২০১৬ সালে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য ফার্মেসির ওপর নির্ভর করতেন। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। ২০১৬ সালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ১০ দশমিক ১ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হতেন। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে প্রায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। ২০০৫ সালে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত মানুষের হার ছিল ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। এসব রোগের চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ওষুধ খেতে হয় বলে পরিবারের নিয়মিত ব্যয়ও বাড়ে।
চিকিৎসার ব্যয় কমাতে সামাজিক সুরক্ষা জরুরি
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, এই গবেষণায় দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্যে গত ১৭ বছরে বিভিন্ন সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মন্তব্যও ছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চিকিৎসার ব্যয় মানুষের আয় ও সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা এবং সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
চিকিৎসার খরচের কারণে মানুষ যেন দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে না যায়, সে জন্য স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো, হাসপাতালের সেবার মান উন্নত করা এবং ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
গবেষণার সামগ্রিক চিত্র বলছে, দেশের স্বাস্থ্যসেবায় শুধু চিকিৎসার সুযোগ বাড়ালেই হবে না; সেই চিকিৎসার খরচ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখাও জরুরি। তা না হলে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আরও বেশি পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

