দেশের জীবন বিমা খাতে আবারও বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে বেসরকারি খাতের ৩৫টি কোম্পানির মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত আইনি সীমা অতিক্রম করে ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত ১৩২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চললেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পলিসিধারীরা। কারণ আইনের বাইরে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়, তার বড় অংশই মূলত গ্রাহকদের প্রাপ্য। পাশাপাশি শেয়ারধারীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ফলে পুরো খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই সমস্যা নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৬ সালে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রথমবারের মতো কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনে। পরে অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি হয়নি। ২০১৮ সালে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ব্যয় ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি।
পরবর্তীতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়। সুপারভাইজরি স্তরের গ্রেড কমিয়ে তিনটিতে আনা হয় এবং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেতন-ভাতা, কমিশন ও অন্যান্য খরচ বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপও প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। বরং সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, অনেক কোম্পানি এখনো নিয়ম ভেঙে ব্যয় বাড়াচ্ছে।
২০২৫ সালের হিসাবে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত ব্যয় ছিল উল্লেখযোগ্য। একটি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত সীমার তুলনায় প্রায় ২৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। অন্য একটি কোম্পানি নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় ১৪ কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ১০ কোটি টাকার কাছাকাছি বা তারও বেশি অতিরিক্ত ব্যয়ের ঘটনা পাওয়া গেছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি কোম্পানি ১ কোটি থেকে ৮ কোটির মধ্যে অতিরিক্ত খরচ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধান কারণ হলো দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাব। অনেক ক্ষেত্রে আয় কমলেও প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় কমাতে আগ্রহী নয়। অপ্রয়োজনীয় জনবল, উচ্চ কমিশন এবং বড় অফিস ব্যয়ের কারণে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান কমিশন কাঠামোও অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি বড় কারণ। সুপারভাইজরি পর্যায়ে উচ্চ কমিশন দেওয়ার ফলে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে কিছু প্রতিষ্ঠানের দাবি, বিমা খাতে আস্থার সংকটও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতে কিছু কোম্পানির অনিয়ম ও দাবি পরিশোধে বিলম্বের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন পলিসি বিক্রি কমে গেছে এবং আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আয় কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় সামঞ্জস্য করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
তবে খাতের অভিজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকলে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব। আয় অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে জীবন বিমা খাত।

