পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র কার্যক্রমে একাধিক গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা না মানা, নির্ধারিত মূলধনের ঘাটতি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা—এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক শৃঙ্খলা ও পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নিরীক্ষায় উঠে এসেছে, নন-লাইফ বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ন্যূনতম ৬০ শতাংশ শেয়ার থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সে এই হার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৭ দশমিক ৭৫ শতাংশে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে সরাসরি আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন।
মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিধিমালা অনুযায়ী যেখানে পরিশোধিত মূলধন অন্তত ৪০ কোটি টাকা থাকার কথা, সেখানে কোম্পানিটির মূলধন রয়েছে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার কিছু বেশি। এতে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানির কোনো পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী সম্পদ নিবন্ধন নেই এবং সম্পদ শনাক্তকরণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সম্পদের সঠিক হিসাব রাখা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিরীক্ষকরা কেবল প্রধান কার্যালয়ের কিছু সম্পদ যাচাই করতে পেরেছেন, যা সার্বিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাই নির্দেশ করে।
এদিকে ২০২৪ সালের জন্য ঘোষিত স্টক লভ্যাংশের মাধ্যমে মূলধন বৃদ্ধির প্রক্রিয়াও এখনও সম্পন্ন হয়নি। প্রয়োজনীয় অনুমোদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে ঝুলে রয়েছে। একই সঙ্গে সহযোগী প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স সিকিউরিটিজ লিমিটেডের হিসাবেও অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। একটি লাইসেন্স বাবদ ব্যয় প্রথমে খরচ হিসেবে দেখানো হলেও পরে সেটি মূলধনী ব্যয় হিসেবে সংশোধন করা হয়েছে, যা কোম্পানির নিট সম্পদ ও শেয়ারপ্রতি আয়ের হিসাবকে প্রভাবিত করেছে।
শেয়ার কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ প্রায় অর্ধেকের বেশি, আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। তবে আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন এবং আর্থিক দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপ পড়তে পারে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। কোম্পানির আর্থিক সূচকেও পতনের ইঙ্গিত রয়েছে। সর্বশেষ বছরে শেয়ারপ্রতি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্যও কিছুটা কমেছে। যদিও নগদ প্রবাহে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে, তবুও সামগ্রিক আর্থিক পারফরম্যান্স দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আয় ও সম্পদ মূল্যে ওঠানামা থাকলেও সর্বশেষ বছরে মুনাফা কমে যাওয়াই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানির পরিচালনা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আইন মেনে চলার বিষয়ে কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। সব মিলিয়ে, আইনি বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা, মূলধনের ঘাটতি এবং দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনার কারণে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হতে পারে।

