বড় অঙ্কের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যেই দেশে বীমার আওতায় থাকা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রায় ৯২৫ কোটি টাকার সংস্কার প্রকল্প চলাকালীন সময়েই পলিসি গ্রহীতার সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ, যা খাতটির কার্যকারিতা ও নীতিগত দিক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশের বীমাখাত উন্নয়ন প্রকল্প’ শুরু হওয়ার সময় জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে বীমা গ্রহীতার সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ। লক্ষ্য ছিল কয়েক বছরের মধ্যে তা ২ কোটিতে উন্নীত করা। কিন্তু বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে এই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৮২ লাখ ২০ হাজারে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এ ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। দেশের ৭৯টি বীমা কোম্পানির মধ্যে মাত্র দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের মূল ফোকাসে রাখা হয়। এতে বেসরকারি খাতের বড় অংশ প্রকল্পের বাইরে থেকে যায়, ফলে সামগ্রিক প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল সেবা মান উন্নয়ন, অটোমেশন চালু এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধার। তবে বাস্তবে অটোমেশন প্রক্রিয়া কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, সফটওয়্যার বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য পূরণ হয়নি। যদিও একটি বহুমডিউল সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে, এর বড় অংশ এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি।
বীমা খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক—জিডিপিতে অবদান—এ সময় কমেছে। ২০১৮ সালে যেখানে বীমার অবদান ছিল ০.৫৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ০.৩৬ শতাংশে। একই সময়ে দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বেশি বাড়লেও বীমা খাত সেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
প্রিমিয়াম আয়ের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ধীরগতি। জীবন বীমায় প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থেকে নেতিবাচকে নেমে এসেছে, আর সামগ্রিকভাবে খাতটির প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থবির অবস্থায় পৌঁছেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। শুরুতে ৬৩২ কোটি টাকার বাজেট থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে ৯২৫ কোটি টাকা করা হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। শেষ পর্যায়ে এসে বড় অঙ্কের ব্যয় বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দক্ষ জনবল ও নেতৃত্বের অভাব প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বীমা খাতে অভিজ্ঞতা না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ঘাটতি দেখা গেছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে জনআস্থার সংকট। সময়মতো দাবি পরিশোধ না হওয়া এবং সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের কারণে নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়া কমে গেছে। ফলে বীমা খাতের প্রসার থমকে গেছে।
তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের কিছু অগ্রগতি—বিশেষ করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। ব্যাংকাস্যুরেন্স, ক্ষুদ্রবীমা ও তাকাফুলের মতো নতুন উদ্যোগও এ সময় সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বীমা খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে কেবল প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা, দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি এবং গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলেই এই খাত আবারও প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে পারে।

