তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলমান বিরোধ এখন করপোরেট সুশাসন ও আইনি বৈধতা নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই হাইকোর্টে রিট দায়েরের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানির ভেতরে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে এবং তা ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পর্যন্ত গড়িয়েছে।
কোম্পানির কয়েকজন পরিচালক অভিযোগ করেছেন, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্তে আদালতে রিট করেছেন। অথচ এ বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদের কোনো সভা হয়নি, এমনকি বোর্ড সদস্যদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, করপোরেট কাঠামোয় এমন সিদ্ধান্ত যৌথভাবে নেওয়ার কথা থাকলেও সেটি উপেক্ষা করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে কয়েকজন পরিচালক লিখিতভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ জমা দেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, রিট দায়েরের জন্য ব্যবহৃত অনুমোদনপত্রে বোর্ড অনুমোদনের কথা বলা হলেও বাস্তবে এমন কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিতর্কের সূত্রপাত মূলত কোম্পানির ২৫তম বার্ষিক সাধারণ সভার পরিচালক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ওই নির্বাচনে ভোট গণনায় অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ ওঠে। পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তদন্ত করায়। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর গত ডিসেম্বরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন নির্দেশনা দেয়।
সেই নির্দেশনায় নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষিত কয়েকজন পরিচালকের পরিবর্তে তদন্তে প্রকৃত বিজয়ী হিসেবে চিহ্নিত অন্য প্রার্থীদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই পরে হাইকোর্টে রিট করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগকারী পরিচালকদের দাবি, নির্বাচনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি, আইনজীবীদের মতামত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার চিঠিপত্রও বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিবও এ বিষয়ে বোর্ডকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
কোম্পানির একজন পরিচালক বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আদালতে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। অন্যদিকে চেয়ারম্যানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে কোম্পানির অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার নিয়েও নতুন অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন পরিচালক দাবি করেছেন, চেয়ারম্যান নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গোপনে নেওয়া হচ্ছে এবং বোর্ডের ভেতরে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
বিমা খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয়; বরং দেশের বিমা খাতে করপোরেট সুশাসনের বাস্তব চিত্রও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে পরিচালক নির্বাচন, বোর্ডের জবাবদিহি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তাঁদের মতে, তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি দুর্বল হলে বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে তা প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা, গ্রাহকস্বার্থ এবং সামগ্রিক বিমা খাতের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

