অবসরের পর আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখন দেশের মধ্যবিত্ত ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বড় বাস্তবতা। সরকারি পেনশনের বাইরে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাই দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও পেনশনভিত্তিক আর্থিক পরিকল্পনার চাহিদা বাড়ছে। এই বাস্তবতায় জীবনবিমাভিত্তিক পেনশন সুবিধা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ বাংলাদেশের ‘লাইফলাইন’ পরিকল্পনা।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই পরিকল্পনার আওতায় গ্রাহক বয়স ১০০ বছর পর্যন্তও পেনশন সুবিধা পেতে পারেন। ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী যে কেউ এ সুবিধার আওতায় যুক্ত হতে পারবেন। পলিসির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে দেড় লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত। গ্রাহকের সুবিধা অনুযায়ী মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক কিংবা বার্ষিক কিস্তিতে প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই বিমা মূলত দীর্ঘমেয়াদি অবসর পরিকল্পনা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার পর পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হলে গ্রাহক নিয়মিত পেনশন তুলতে পারেন। আবার পলিসি চালু থাকা অবস্থায় গ্রাহকের মৃত্যু হলে মনোনীত ব্যক্তি বিমা সুবিধা পান। ফলে এটি একদিকে সঞ্চয়, অন্যদিকে আর্থিক ঝুঁকি সুরক্ষার ব্যবস্থাও তৈরি করে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, গ্রাহকের বয়স, পলিসির মেয়াদ এবং ভবিষ্যতে কত পরিমাণ পেনশন চান—এসব বিবেচনায় প্রিমিয়ামের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে হাসপাতাল ব্যয় সহায়তা, জটিল রোগের সুরক্ষা, দুর্ঘটনা বিমা ও প্রিমিয়াম মওকুফ সুবিধাও যুক্ত করা যায়। তবে এসব সুবিধা যুক্ত হলে প্রিমিয়ামের পরিমাণও বাড়ে।
বিমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সরকারি চাকরির বাইরে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও বাধ্যতামূলক পেনশন ব্যবস্থা এখনও সীমিত। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রবাসীদের বড় অংশকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য আলাদা পরিকল্পনা করতে হয়। এই শূন্যস্থান থেকেই পেনশনধর্মী বিমা পণ্যের বাজার ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের গড় আয়ু বাড়ার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কর্মজীবন শেষে নিয়মিত আয়ের উৎস না থাকলে মধ্যবিত্ত পরিবার বড় আর্থিক চাপে পড়তে পারে। এই কারণে দীর্ঘমেয়াদি পেনশনভিত্তিক বিমা পরিকল্পনার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। কর রেয়াত সুবিধা এবং ব্যাংকের মাধ্যমে বিমা বিক্রির সুযোগ চালু হওয়ায় এ ধরনের পণ্যের প্রসার আরও বেড়েছে।
তবে এসব বিমা পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্নও কম নয়। সবচেয়ে বড় আলোচনা থাকে সম্ভাব্য মুনাফা ও প্রকৃত রিটার্ন নিয়ে। অনেক গ্রাহক ব্যাংকের ডিপিএস বা এফডিআরের সঙ্গে বিমার তুলনা করেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, বিমার প্রধান উদ্দেশ্য সরাসরি মুনাফা নয়; বরং আর্থিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া। ফলে বিমা ও ব্যাংক আমানতের লাভের হিসাব একভাবে বিচার করা ঠিক নয়।
তারপরও কিছু গ্রাহকের অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার পর প্রত্যাশার তুলনায় কম অর্থ ফেরত পাওয়া যায়। আবার অনেকে দাবি করেন, সম্ভাব্য বোনাস বা ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে শুরুতেই স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয় না। অন্যদিকে দ্রুত দাবি নিষ্পত্তি ও গ্রাহকসেবার প্রশংসাও করেছেন কেউ কেউ। তবে কাগজপত্রের জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে অসন্তোষও রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি বিমা নেওয়ার আগে ব্যক্তির আয় স্থিতিশীল কি না, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাঝপথে পলিসি বন্ধ করলে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভবিষ্যতে প্রকৃত রিটার্ন কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, শুধু এজেন্টের কথার ওপর নির্ভর না করে পলিসির শর্ত, সম্ভাব্য মুনাফা, মৃত্যু–সুবিধা, আগাম বন্ধ করলে ফেরত অর্থ এবং অতিরিক্ত সুবিধার খরচ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত, মিউচুয়াল ফান্ড কিংবা সরকারি পেনশন স্কিমের সঙ্গে তুলনা করেও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এখন অবসর–পরবর্তী নিরাপত্তা শুধু বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠছে। আর সেই জায়গায় দীর্ঘমেয়াদি বিমা ও পেনশনভিত্তিক সঞ্চয় প্রকল্প সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসছে।

