মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি মোকাবিলা, দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় গড়ে তোলা এবং বিনিয়োগে বীমা খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাত প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজেট বক্তৃতায় বীমা শিল্পের জন্য আলাদা কোনো নীতিগত সংস্কার, করপোরেট কর কমানো বা বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা নেই। যদিও সীমিত পরিসরে কয়েকটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো বিদেশি পুনর্বিমা প্রতিষ্ঠানে দেওয়া প্রিমিয়ামের ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক মৎস্য খামারের জন্য বিশেষ বীমা চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশি পুনর্বিমা প্রতিষ্ঠানে পরিশোধিত প্রিমিয়ামের ওপর উৎসে কর অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর পুনর্বিমা ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক পুনর্বিমা সেবা গ্রহণ আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র, জাহাজ, বিমান এবং অবকাঠামো প্রকল্পের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পুনর্বিমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর কমানোর ফলে পরিচালন ব্যয় কিছুটা কমবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হতে পারে।
বাজেটে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক মৎস্য খামারের জন্য বিশেষ বীমা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন রোগে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষি বীমার পাশাপাশি মৎস্য বীমা চালু হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য জীবন বীমার প্রিমিয়ামের বিপরীতে যে কর রেয়াত আগে থেকে রয়েছে, সেটি বহাল রাখা হয়েছে। তবে এই সুবিধার পরিমাণ বাড়ানো হয়নি। একই সঙ্গে নতুন কোনো কর প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়নি। অন্যদিকে বীমা কোম্পানিগুলোর করপোরেট করহারেও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কর-সংক্রান্ত যে দাবিগুলো জানানো হচ্ছিল, সেগুলো এবারও পূরণ হয়নি।
এবারের বাজেটে বীমা খাতের জন্য আলাদা কোনো প্রণোদনা বা বিশেষ তহবিল না থাকলেও সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এককালীন বিশেষ সহায়তা প্যাকেজের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা, ডিজিটাল নজরদারি, তাৎক্ষণিক তথ্যনির্ভর পর্যবেক্ষণ, কমিশন কাঠামোর সংস্কার, গণনাবিদদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বীমা পণ্য চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
বীমা কোম্পানিগুলোর অভিযোগ, বহু বছর ধরে করপোরেট করহার কমানো, ভ্যাট ও কর কাঠামো যৌক্তিক করা, লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা দূর করা এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানানো হলেও এবারের বাজেটে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে বীমা শিল্পের প্রত্যাশিত সম্প্রসারণে বাজেট থেকে বড় ধরনের সহায়তা মিলছে না বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে বীমা খাতের অবদান এখনও ১ শতাংশের নিচে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় দেশে বীমা গ্রহণের হারও অনেক কম। সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে গ্রাহকের আস্থাহীনতা।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শুরুতে জীবন বীমায় সক্রিয় পলিসির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৮ লাখ। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সেই সংখ্যা কমে প্রায় ৬৮ লাখে নেমে এসেছে। অর্থাৎ আড়াই বছরে ১০ লাখের বেশি পলিসি হারিয়েছে এই খাত। একই সময়ে জীবন বীমায় দাবি নিষ্পত্তির হার মাত্র ৩৫ শতাংশ। সাধারণ বীমায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। উত্থাপিত দাবির প্রায় ৯২ শতাংশই এখনও বকেয়া রয়েছে। ফলে নতুন গ্রাহক যেমন বিমুখ হচ্ছেন, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এই খাত থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ বীমা কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বিদেশি অংশীদারিত্ব থাকলেও অনেক কোম্পানিতে তা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব, সময়মতো দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন বাজেট ঘোষণার আগে করপোরেট কর কমানো, ভ্যাট ও কর কাঠামো যৌক্তিক করা, তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানিকে বাধ্যতামূলক নগদ লভ্যাংশ নীতি থেকে অব্যাহতি, লাইসেন্স নবায়নের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা এবং সুশাসন নিশ্চিতে নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছিল কিন্তু এসব দাবির অধিকাংশই এবারের বাজেটে স্থান পায়নি। ফলে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বাজেটে বীমা শিল্পকে সরাসরি কর-সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও সুশাসনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুনর্বিমার উৎসে কর কমানো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও দীর্ঘদিনের সব সংকট দূর করার জন্য এটি যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, সময়মতো দাবি নিষ্পত্তি, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা, ডিজিটাল তদারকি জোরদার করা এবং গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার ছাড়া শুধু কর-সুবিধা দিয়ে বীমা খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে না।
তবে এসব সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বীমা খাত দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

