গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন বীমা দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবির অর্থ আটকে রয়েছে জানিয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, সব ধরনের বিকল্প উপায় কাজে লাগিয়েও যদি এই সংকটের সমাধান সম্ভব না হয়, তাহলে সরকারের কাছে এককালীন আর্থিক সহায়তা বা ‘ওয়ান-টাইম বেইলআউট’ চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
শনিবার রাজধানীতে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘বীমা খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত এক সপ্তাহে তিনি খাতটির সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করেছেন। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই নয়, বাস্তবভিত্তিক সমাধান নিশ্চিত করতেই একটি সংস্কার কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য তিনটি—গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন, বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
তিনি জানান, বর্তমানে জীবন ও সাধারণ বিমা—উভয় খাত মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে। প্রতিটি বিমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, সম্পদ ও দায় আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে কীভাবে দ্রুত দাবি পরিশোধ সম্ভব, তা নির্ধারণ করা হবে। প্রয়োজন হলে আটকে থাকা সম্পদ বিক্রি, আদায়যোগ্য অর্থ উদ্ধার কিংবা অন্য আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, অনেক বিমা প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী আমানতের অর্থ দুর্বল ব্যাংকে আটকে থাকায় তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী নগদায়নের সুযোগও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সব বিকল্প ব্যবস্থার পরও যদি বড় অঙ্কের দায় অবশিষ্ট থাকে, তখন সরকারের কাছে বিশেষ আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। তবে তার আগে বিমা কোম্পানি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের সংকট আর তৈরি না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও সরকারের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
বিমা খাতকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও বিমা শিল্প সেই অনুপাতে এগোতে পারেনি। অথচ উন্নত দেশগুলোতে বিমা শুধু ঝুঁকি মোকাবিলার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও কাজ করে।
তিনি মনে করেন, একটি শক্তিশালী বিমা শিল্প গড়ে উঠলে দেশের পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমা কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারের বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশেও সে ধরনের সক্ষমতা তৈরি হলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়বে এবং মূলধন বাজার আরও গভীর হবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বিমা খাতের ভূমিকা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। বিমার আওতা বাড়ানো গেলে এসব ঝুঁকির একটি বড় অংশ বেসরকারি বিমা ব্যবস্থার মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক চাপও কমবে।
ক্ষুদ্র আয়ের মানুষের জন্য মাইক্রোইনস্যুরেন্স সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। সেই অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য বিমা সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইসলামি বিমা বা তাকাফুল খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমা বিষয়ে বিভাগ, বিশেষায়িত কোর্স এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এতে একদিকে দক্ষ জনবল তৈরি হবে, অন্যদিকে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, বিমা খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সফল করতে সরকার, বিমা কোম্পানি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। সবাইকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে এনে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও টেকসই বিমা খাত গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

