দেশের আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ কমানো, ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর তারল্য বাড়ানো এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই উদ্যোগের আওতায় খেলাপি ঋণ আদায়ে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে বেশ কয়েকটি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যাতে ঋণ পুনরুদ্ধার সহজ হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারাও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান।
বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই ২০২৬) এ বিষয়ে পৃথক দুটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব ফাইন্যান্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। নির্দেশনাগুলো অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে এবং আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো এখন গ্রাহকের ঋণের সুদ মওকুফ করতে পারবে। প্রয়োজনে নিজেদের আয় থেকেও এই সুদ সমন্বয় করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—মূল ঋণের অর্থ কোনো অবস্থাতেই মওকুফ করা যাবে না।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণগ্রহীতারা মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তাদের ঋণ ১০ বছরের জন্য নবায়ন করতে পারবেন। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধ শুরু করার আগে ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা ছাড়ের সময়ও দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণে অনেক উদ্যোক্তা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। অর্থনৈতিক সংকট, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির কারণে বহু ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, পুনঃতফসিল ও বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে একদিকে যেমন ঋণ আদায় বাড়বে, অন্যদিকে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবে। এতে আর্থিক খাতের ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নতুন নীতিমালার আওতায় গত ৩০ জুন পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ঋণ এককালীন পরিশোধের সুযোগও রাখা হয়েছে। কোনো উদ্যোক্তা যদি পুরো মূল ঋণ একবারে পরিশোধ করেন, তাহলে তার ওপর আরোপিত সুদের বড় অংশ মওকুফ করার সুযোগ পাবে সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি।
এ ক্ষেত্রে আগে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অংশ আদায় বাধ্যতামূলক থাকলেও নতুন নির্দেশনায় সেই শর্ত শিথিল করা হয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের আয় থেকে সমন্বয় করে সুদ মওকুফ করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, এই সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি খাত, কুটির শিল্প, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে যেসব ঋণ নবায়ন করা হয়েছে, সেগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে সব খেলাপি গ্রাহক এই সুবিধা পাবেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার কিংবা ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসবে না।
অন্য সার্কুলারে বলা হয়েছে, যেসব উদ্যোক্তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কারণে খেলাপি হয়েছেন, তারা ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রথম ২ বছর কিস্তি পরিশোধে ছাড় থাকবে, যাতে উদ্যোক্তারা ব্যবসা পুনরায় সচল করার সময় পান।
বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই পুনঃতফসিলসংক্রান্ত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই নীতিমালা স্বল্পমেয়াদে খেলাপি ঋণ আদায় এবং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর তারল্য সংকট কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছেন, যাতে এই সুবিধার অপব্যবহার না হয় এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারাই এর সুফল পান। দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল রাখতে সুশাসন, কঠোর নজরদারি এবং ঋণ বিতরণে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

