শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ, বিতর্কিত সনদ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন—এসব বিতর্কের মধ্যেই টানা ১২ বছর ধরে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. গোলাম কিবরিয়া।
বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নীতিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ না হলে কোনো ব্যক্তিকে বিমা কোম্পানির সিইও পদে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় গোলাম কিবরিয়ার নিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৪ সালে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সিইও হিসেবে মো. গোলাম কিবরিয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই বছরের ২৮ আগস্ট তার নিয়োগ অনুমোদন দেয় আইডিআরএ। তবে তার দাখিল করা শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য ও সনদ নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, নিয়োগ অনুমোদনের সময় এসব তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না।
প্রবিধান অনুযায়ী যোগ্যতার শর্ত:
বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা-২০১২ অনুযায়ী, সিইও পদে নিয়োগ পেতে হলে প্রার্থীকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।
প্রবিধানের ৩(ক) অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সিইওকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম তিন বছর মেয়াদি স্নাতক ও এক বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা চার বছর মেয়াদি স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রির অধিকারী হতে হবে। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না হলে কোনো বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার।
শিক্ষাগত তথ্য নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ:
আইডিআরে জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে মো. গোলাম কিবরিয়া উল্লেখ করেন, তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ), ১৯৯২ সালে প্রিলিমিনারি এবং ১৯৯৬ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়া তিনি দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রির একটি সনদও জমা দেন।
তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার উল্লেখ করা শিক্ষাগত যোগ্যতা বিমা কোম্পানির সিইও নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এদিকে দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির এমবিএ সনদ নিয়েও তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দাখিল করা সনদে দেখা যায়, এটি ৫ জানুয়ারি ২০১১ সালে ইস্যু করা হয়েছে এবং এমবিএ সম্পন্নের সালও ২০১১ উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আইডিআরে জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে এমবিএ পাসের বছর হিসেবে ২০১০ সালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই ব্যক্তির শিক্ষাগত তথ্য ও সনদে এমন পার্থক্য থাকায় নিয়োগ অনুমোদনের সময় বিষয়গুলো কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাইয়ের বিষয়টি সংস্থার নজরে রয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের যাচাই আরও কঠোর করা হবে। তিনি জানান, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য যাচাই, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় এবং সিআইবির মাধ্যমে প্রার্থীর পটভূমি যাচাইয়ের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিমা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সিইও নিয়োগের আগে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ সব তথ্য কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বিমা কোম্পানির এক সিইও বলেন, বিমা খাতে জাল বা বিতর্কিত শিক্ষাগত সনদ ব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। বর্তমানে একাধিক সিইওর যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে তারা দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার মতে, এ ধরনের ঘটনায় পুরো বিমা খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত নিয়োগ অনুমোদনের আগে সব তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা।
শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে মো. গোলাম কিবরিয়ার বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। ফোন রিসিভ করা ব্যক্তি নিজেকে রূপালী লাইফে নেই বলে জানান এবং পরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বিতর্কিত বা জাল সনদের মাধ্যমে কেউ বিমা কোম্পানির সিইও পদে দায়িত্ব পালন করছেন কি না—এ বিষয়ে আইডিআরএর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন জানান, বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং যাচাই প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

