দেশের ব্যাংকিং খাতের মতো নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও গত সরকারের আমলে দখলদারিত্ব, অনিয়ম ও দুর্নীতির ছায়া পড়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে এই খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে, ফলে বেশ কয়েকটি ফাইন্যান্স কোম্পানি এখন চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমনই এক প্রতিষ্ঠান উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, যার আর্থিক ভিত এখন রীতিমতো নড়বড়ে অবস্থায় পৌঁছেছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে।
পুঁজিবাজারের তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত মুনাফার ধারায় ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে এরপর থেকেই শুরু হয় পতনের গল্প। ২০১৯ সালে কোম্পানির মূল হিসাবপত্রে প্রায় ১১৮ কোটি টাকা মুনাফা দেখানো হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে পরবর্তীতে পরিচালিত এক বিশেষ নিরীক্ষায় সেই হিসাব পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র সামনে আনে— খুঁজে পাওয়া যায় প্রায় পাঁচ হাজার তিনশ কোটি টাকার আর্থিক অসামঞ্জস্য। এরপর সংশোধিত হিসাবে সেই বছরের মুনাফা রূপান্তরিত হয় প্রায় ২৯৪ কোটি টাকার লোকসানে।
পরের বছরগুলোতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং আরও খারাপের দিকে গড়িয়েছে। পরবর্তী বছর লোকসানের অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৭৩ কোটি টাকায়, আর তার পরের বছরও লোকসান হয় প্রায় ৩০৯ কোটি টাকা। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো আর্থিক হিসাব প্রকাশই করেনি।
শুধু আর্থিক ফলাফল প্রকাশে অনীহাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে নিয়মিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজনও। সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী প্রতিবছর এসব প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক হলেও টানা চার বছর ধরে কোনো হালনাগাদ তথ্যই দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। বিস্ময়করভাবে এত সবকিছুর পরও শেয়ারবাজারে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার লেনদেন চলছিল স্বাভাবিকভাবেই।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে চলতি বছরে এসে অবশেষে পুরোনো তিন বছরের সংশোধিত আর্থিক হিসাব প্রকাশ করেছে কোম্পানিটি, যেখানে ফুটে উঠেছে বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম ও লোকসানের প্রকৃত চিত্র। খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা এই পুরো পরিস্থিতির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর গাফিলতিকেই দায়ী করছেন।
একটি ব্যাংকিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক মহাপরিচালক এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তাঁর প্রশ্ন, টানা পাঁচ বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠান আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয় না, তার শেয়ার কীভাবে নিয়মিত মূল্যায়িত বা রেটিং করার সুযোগ পায়। তিনি মনে করেন, শুধু প্রতিষ্ঠানকে নয়, এই ব্যর্থতার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত, কারণ এমন দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ম নিয়ন্ত্রকদের নজরদারি ছাড়া সম্ভব নয় বলেই তাঁর ধারণা।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসন ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তারা কাজ করছে এবং ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটিতে একজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানান, প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কার্যক্রমে তারা মোটেও সন্তুষ্ট নন, আর সে কারণেই নতুন প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশাসকই এখন খতিয়ে দেখবেন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কী কী অনিয়ম ঘটেছে, বিশেষত টানা পাঁচ বছর ধরে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার প্রকৃত কারণ কী। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিছক গাফিলতি নাকি কোনো বিশেষ পরিস্থিতির কারণে ঘটেছে, তাও তদন্ত করে দেখা হবে।
সম্প্রতি দায়িত্ব নেওয়া প্রশাসক জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের অডিট প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের পাশাপাশি ভাউচার ও আর্থিক লেনদেনের ধারাবাহিক তথ্যও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো হাতে আসেনি বলে জানান তিনি। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে চলমান কয়েকটি মামলাও পর্যালোচনার অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক চিত্র সম্পূর্ণরূপে যাচাই করা বাস্তবসম্মত নয়, তবে প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষ হয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে বিস্তারিত কার্যক্রম শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া এই প্রতিষ্ঠান গত সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ প্রদান করেনি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রক তদারকির এই ধরনের দুর্বলতা যদি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অব্যাহত থাকে, তাহলে পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

