মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ব্যবসা ও জীবন বীমা তহবিল, দুটিই টানা কমছে। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে মোট প্রিমিয়াম আয় কমেছে ১০৬ কোটি টাকার বেশি। একই সময়ে জীবন তহবিল কমেছে প্রায় ২৯৪ কোটি টাকা। গ্রাহকের দাবি পরিশোধে অনিয়ম নিয়ে খাতজুড়ে যখন উদ্বেগ চলছে, তখন এই চিত্র নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
কোম্পানির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৩৮৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ২০২২ সালে তা সামান্য বেড়ে হয় ৩৯১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এরপর ২০২৩ সালে কমে ৩৮২ কোটি ৯৫ লাখ, ২০২৪ সালে ৩৩৬ কোটি ১০ লাখ এবং ২০২৫ সালে ২৮২ কোটি টাকায় নেমে আসে।
জীবন তহবিলের অবস্থাও একই। ২০২১ সালে তহবিল ছিল ১ হাজার ৮৬৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ২০২২ সালে তা কমে ১ হাজার ৭৯১ কোটি ৯৫ লাখ, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৬৭৫ কোটি ১০ লাখ এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৬০৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা হয়। ২০২৫ সালে তহবিল দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ৫১ লাখ টাকায়। গ্রাহকের ভবিষ্যৎ দাবি পরিশোধের সক্ষমতার অন্যতম সূচক এই তহবিল। তাই এর টানা পতন কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ব্যবসা কমার বড় কারণ নতুন পলিসি সংগ্রহে দুর্বলতা। ২০২৩ সালে প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় ছিল ৭৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ৪৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। কোম্পানি এর কারণ হিসেবে মূল্যস্ফীতির চাপ, মানুষের তারল্য সংকট ও ভোক্তার আচরণের পরিবর্তনের কথা বলেছে। পুরোনো পলিসির দাবি পরিশোধ চললেও নতুন ব্যবসা থেকে পর্যাপ্ত প্রিমিয়াম আসছে না। এতে তহবিলের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বীমা দাবি পরিশোধের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২১ সালে দাবি পরিশোধ হয়েছিল ৩৭৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৪২০ কোটি ৭৭ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৪৪৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ৩৬৩ কোটি ৩৯ লাখ এবং ২০২৫ সালে ২৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
অঙ্ক কমলেও কয়েক বছর দাবি পরিশোধ মোট প্রিমিয়াম আয়ের চেয়ে বেশি ছিল। ২০২৩ সালে দাবি-প্রিমিয়াম অনুপাত ছিল ১১৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা ছিল ১০৮ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০২৫ সালেও একই অবস্থা। ওই বছর প্রিমিয়াম আয় ছিল ২৮২ কোটি টাকা, আর দাবি পরিশোধ হয়েছে ২৮৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ সেই বছরের প্রিমিয়াম দিয়ে দাবির অঙ্ক মেটেনি।
জীবন তহবিলের অন্যতম উৎস বিনিয়োগ আয়ও কয়েক বছর ধরে নিম্নমুখী। ২০২০ সালে এই আয় ছিল ৯৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। ২০২১ সালে ৮৯ কোটি ৭৬ লাখ, ২০২২ সালে ৮৫ কোটি ৭৯ লাখ এবং ২০২৩ সালে ৬৮ কোটি ৭২ লাখ টাকায় নামে। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে হয় ৭৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। বার্ষিক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক চাপ, বাড়তি দাবি পরিশোধের দায় ও বাজারের অস্থিরতাকে এর কারণ বলা হয়েছে।
ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। ২০২১ সালে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ছিল ১০৭ কোটি ১২ লাখ টাকা, ২০২৫ সালে তা কমে ৬৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা হয়েছে। কমিশন ব্যয় ৪৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা থেকে কমে হয়েছে ২৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে ব্যয় কমলেও প্রিমিয়াম আয়, নতুন ব্যবসা, বিনিয়োগ আয় ও জীবন তহবিলের দুর্বলতা কাটেনি।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো জীবন বীমা কোম্পানির ব্যবসা ও তহবিল দীর্ঘ সময় কমতে থাকলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিবিড় পর্যালোচনা দরকার। সময়মতো ঝুঁকি চিহ্নিত না হলে ভবিষ্যতে গ্রাহকের দাবি পরিশোধে চাপ তৈরি হতে পারে।
মেঘনা লাইফের আর্থিক দুর্বলতার বিষয়ে জানতে চাইলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) মুখপাত্র আরমান বলেন, চেয়ারম্যান বর্তমানে বীমা দাবি পরিশোধকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। আইডিআরএর সব কার্যক্রম ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ চলছে। এটি শেষ হলে কোম্পানিগুলোর সমস্যা নিয়ে সহজে কাজ করা যাবে। যেসব কোম্পানির প্রিমিয়াম ও জীবন তহবিল-সংক্রান্ত সমস্যা আছে, সেগুলো নিয়েও কাজ হবে বলে জানান তিনি।
মেঘনা লাইফের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকে তাঁদের বিপুল অর্থ আটকা পড়েছে। শুধু তাঁদের নয়, আরও অনেক বীমা কোম্পানির টাকা আটকে আছে। এ কারণে সময়মতো গ্রাহকের টাকা দেওয়া যাচ্ছে না। এই সংকট কাটাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মত দেন তিনি।
কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ (পাভেল) বলেন, পদ্মা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সম্মিলিত পাঁচ ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা টাকা ফেরত পেলে গ্রাহকদের পাওনা মেটানো সম্ভব। না হলে তাঁদের রাস্তায় নামতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এরই মধ্যে মেঘনা লাইফসহ কয়েকটি বীমা কোম্পানিতে প্রায় ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার বীমা দাবি আটকে আছে। আইডিআরএর এক ঊর্ধ্বতন সদস্য জানান, একীভূত পাঁচ ব্যাংক ও একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা অর্থ বীমা কোম্পানিগুলো তুলতে পারছে না। তাই ইচ্ছা থাকলেও অনেক কোম্পানি এখন গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, আটকে থাকা এই অর্থ তোলার বিষয়ে শিগগির আইডিআরএ, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের কথা ভাবা হচ্ছে। তাঁর আশা, সবাই বসলেই বিষয়টির সমাধান হবে।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, মেঘনা লাইফের আমানত ও অন্যান্য পাওনা রয়েছে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং রিলায়েন্স ফাইন্যান্সে (আগের নাম অ্যাভিভা ফাইন্যান্স)। এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকট, পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা অবসায়নের প্রক্রিয়ায় আছে। ফলে সেখানে রাখা আমানত ও পাওনা ফেরত পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।

