বিমা পলিসির আড়ালে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও নিষিদ্ধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ ঠেকাতে দেশের সব বিমা কোম্পানির জন্য নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এখন থেকে বেনামে, ছদ্মনামে বা কাল্পনিক পরিচয়ে বিমা পলিসি খোলা বা পরিচালনা করা যাবে না। একই দিনে কোনো গ্রাহকের ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন হলে সেই তথ্যও বিএফআইইউকে জানাতে হবে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) জারি করা ৩৪ নম্বর সার্কুলারে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত এবং বিমা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিএফআইইউর ওয়েবসাইটেও সার্কুলারটি প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনায় বিমা কোম্পানিগুলোকে গ্রাহক পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে বলা হয়েছে। পলিসি খোলার আগে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট, ছবি ও ঠিকানার মতো তথ্য নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন উৎস থেকে যাচাই করতে হবে। কোনো ব্যক্তি অন্য কারও পক্ষে পলিসি খুললে বা পরিচালনা করলে তাঁর আইনগত ক্ষমতা ও অনুমোদনও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পলিসির প্রকৃত সুবিধাভোগী কে, অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত কে এর আর্থিক সুবিধা পাবেন, সেই তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে পলিসি খোলা হলে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি এবং ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিকদের প্রকৃত সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য রাখতে হবে।
নগদ লেনদেনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। কোনো গ্রাহক এক দিনে মোট ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন করলে সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানিকে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন বা সিটিআর জমা দিতে হবে। এসব লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে। তবে প্রতিটি বড় লেনদেনই যে অর্থপাচারের প্রমাণ, তা নয়। নির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো, বড় অঙ্কের নগদ লেনদেনের তথ্য নিয়মিতভাবে কর্তৃপক্ষের নজরে আনা, যাতে সন্দেহজনক লেনদেনের ধরন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাই করা যায়। এ ছাড়া কোনো লেনদেনের পেছনে স্পষ্ট অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য না থাকলে, কিংবা লেনদেন জটিল ও অস্বাভাবিক মনে হলে, তা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
বিএফআইইউর নির্দেশনায় শুধু গ্রাহক পর্যায়ের যাচাই নয়, বিমা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিমা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বা সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও বিস্তার-অর্থায়ন প্রতিরোধে নিজস্ব নীতিমালা থাকতে হবে। এ নীতিমালা কার্যকর করার দায়িত্ব থাকবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর। কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিমা এজেন্টদের কাছ থেকেও প্রতিবছর এ বিষয়ে অঙ্গীকার নিতে হবে। প্রধান কার্যালয়ে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট গঠন করতে হবে। এই ইউনিটের প্রধান হিসেবে থাকবেন প্রধান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা বা সিএএমএলসিও। ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন পর্যবেক্ষণ, গ্রাহকের পরিচয় ও প্রকৃত মালিকানা যাচাই এবং সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন তৈরিতে এই ইউনিট দায়িত্ব পালন করবে।
প্রতিবছরের পরিপালন কার্যক্রমের হিসাবও নিয়মিতভাবে জমা দিতে হবে। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যক্রম, মূল্যায়ন ও সুপারিশ নিয়ে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিটকে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। প্রধান নির্বাহীর মতামতসহ প্রতিবেদনটি পরিচালনা পর্ষদ বা সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় উপস্থাপন করতে হবে এবং পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এর একটি অনুলিপি বিএফআইইউতে পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি শাখা ও ইউনিটে অন্তত তিন বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। বিমা এজেন্টদের ক্ষেত্রেও এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনোনয়নের নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ, দায়িত্ব শুধু প্রধান কার্যালয়ের একটি বিভাগে সীমাবদ্ধ থাকছে না; শাখা ও এজেন্ট পর্যায়েও নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বিদেশি বাণিজ্যসংক্রান্ত বিমার ক্ষেত্রেও নথিপত্র যাচাইয়ের ওপর জোর দিয়েছে বিএফআইইউ। আমদানি-রপ্তানি পলিসির ক্ষেত্রে ঋণপত্র বা এলসির নম্বর, বাণিজ্য চুক্তি, পণ্যের বিবরণ এবং জাহাজীকরণসংক্রান্ত নথি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের তালিকাভুক্ত ব্যক্তি বা সত্তা এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বিমা পলিসি খোলা বা পরিচালনা করা যাবে না। এর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিমা ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর আওতায় বিএফআইইউ এই নির্দেশনা জারি করেছে। এর লক্ষ্য বিমা খাতকে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও বিস্তার-অর্থায়নের অপব্যবহার থেকে সুরক্ষিত রাখা। তবে নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার প্রকৃত ফল নির্ভর করবে কোম্পানিগুলো কতটা নিয়মিতভাবে গ্রাহকের তথ্য যাচাই করছে, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করছে এবং পরিপালনের ঘাটতি পেলে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তার ওপর। বিমা পলিসি শুধু ঝুঁকি সুরক্ষার আর্থিক চুক্তি নয়; যথাযথ নজরদারি না থাকলে এটি আর্থিক অপরাধের সুযোগ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে সেই ঝুঁকি কমাতে বিমা কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।

