জীবন বীমা গ্রাহকের পাওনা টাকা পরিশোধ না করে সেই অর্থে নতুন পলিসি চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে সার্কুলার জারি করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ দাবি, মৃত্যুদাবি বা সারভাইভাল বেনিফিটের পুরো টাকা গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে একসঙ্গে পরিশোধ করতে হবে। কোনো অজুহাতে সেই অর্থ কেটে রেখে বা সমন্বয় করে নতুন পলিসি দেওয়া যাবে না। এই নিয়ম না মানলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপর নতুন পলিসি খোলার নিষেধাজ্ঞা আসবে।
আইডিআরএ জানিয়েছে, গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, কিছু জীবন বীমা কোম্পানি মেয়াদোত্তীর্ণ দাবি, মৃত্যুদাবি কিংবা সারভাইভাল বেনিফিট দেওয়ার সময় গ্রাহককে একই কোম্পানিতে নতুন পলিসি কিনতে বাধ্য করছে, এমন তথ্য তাদের কাছে এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের পলিসির প্রাপ্য অর্থ থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম কেটে রেখে সামান্য অঙ্কের টাকা গ্রাহক বা নমিনিকে দেওয়া হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্পষ্ট করেছে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বীমা দাবি পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে পুরো অর্থ সরাসরি গ্রাহক বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তির (নমিনি) ব্যাংক হিসাবে পাঠানো বাধ্যতামূলক। দাবি পরিশোধের সময় নতুন পলিসি কিনতে বাধ্য করা কিংবা নতুন পলিসির প্রিমিয়াম হিসেবে টাকা কেটে রাখার আইনি কোনো সুযোগ নেই। আইডিআরএ একে সম্পূর্ণ আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে গ্রাহকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, তাঁদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং পুরো বীমা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সার্কুলারে কেটে রাখার বিষয়ে আরও কড়াকড়ি আছে। দাবি মেটানোর সময় প্রযোজ্য সরকারি রাজস্ব, অর্থাৎ কর ও ভ্যাট ছাড়া অন্য কোনো অজুহাতে কোনো চার্জ বা ফি কাটা যাবে না। পুরো পাওনা টাকা গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে এককালীন স্থানান্তর করতে হবে।
নিষেধাজ্ঞার সময়সীমাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন পার হওয়ার পরের এক মাসের মধ্যে দাবি পরিশোধ করা হলেও পরিশোধের তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে ওই বীমাগ্রহীতার নামে নতুন কোনো পলিসি খোলা যাবে না। আর দাবির মেয়াদ শেষ হওয়ার চার মাসের মধ্যেও যদি টাকা পরিশোধ না করা হয়, তবে পরিশোধের তারিখ থেকে পরবর্তী ছয় মাস ওই গ্রাহকের নামে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি নতুন কোনো পলিসি খুলতে পারবে না।
এই নির্দেশনার তাৎপর্য বোঝার জন্য সাধারণ গ্রাহকের অবস্থান বিবেচনা করা দরকার। একজন গ্রাহক বছরের পর বছর প্রিমিয়াম দিয়ে মেয়াদ শেষে একটি অঙ্কের টাকা পাওয়ার আশা করেন। অনেক পরিবারের জন্য এই অর্থ চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা বা অন্য জরুরি প্রয়োজনের ভরসা। মৃত্যুদাবির ক্ষেত্রে এই টাকা শোকাহত পরিবারের একমাত্র আর্থিক অবলম্বন হয়ে ওঠে। এমন সময় যদি সেই অর্থ থেকে নতুন পলিসির প্রিমিয়াম কেটে নেওয়া হয়, তাহলে গ্রাহক বা নমিনি প্রকৃত পাওনা থেকে বঞ্চিত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের চর্চার পেছনে কোম্পানিগুলোর নতুন ব্যবসা ও প্রিমিয়াম আয় বাড়ানোর তাগিদ কাজ করে থাকতে পারে। কিন্তু এতে বীমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়। বাংলাদেশে বীমা খাত আগে থেকেই দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা ও আস্থার সংকটের অভিযোগে সমালোচিত। এই প্রেক্ষাপটে আইডিআরএর নতুন সার্কুলার গ্রাহকস্বার্থ রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে নির্দেশনা কাগজে থাকলেই যথেষ্ট নয়, বাস্তবে মানা হচ্ছে কি না, তা নজরে রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ। গ্রাহকেরা অনেক সময় অভিযোগ করতে দ্বিধা করেন, আবার কীভাবে অভিযোগ করতে হয়, তা-ও সবাই জানেন না। তাই নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ গ্রহণের সহজ ব্যবস্থা এবং নিয়ম ভাঙলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। পাওনা টাকা থেকে কোনো কর্তন করা হলে বা নতুন পলিসি কিনতে চাপ দেওয়া হলে তা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানানোর সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে সার্কুলারটি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। দাবি পরিশোধ গ্রাহকের আইনগত অধিকার, কোনো কোম্পানির সুবিধার বিষয় নয়। এই নিয়ম কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রাহকের ভোগান্তি কমবে এবং বীমা খাতের প্রতি আস্থা ফেরানোর পথও সুগম হবে।

