ভারতের ছত্রিশগড় রাজ্যে একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণে অন্তত ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও ২২ জন। মঙ্গলবার দুপুরে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা শুধু একটি শিল্পদুর্ঘটনাই নয়, বরং দেশটির শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে রাজ্যের শক্তি জেলার সিংহিতারাই গ্রামে অবস্থিত বেদান্ত লিমিটেড-এর বিদ্যুৎকেন্দ্রে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একটি বয়লার টিউবে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে মুহূর্তেই আগুন ও চাপের তাণ্ডবে কর্মরত শ্রমিকরা ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়, আর পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও সাতজন।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বয়লার রুমের ভেতরে এখনো কয়েকজন শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
জেলার পুলিশ সুপার প্রফুল্ল ঠাকুর জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল ছিল এবং বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে অনেককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, যেখানে তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এই দুর্ঘটনাকে ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক’ উল্লেখ করে ছত্রিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এ ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে—দায়িত্বের প্রশ্ন। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মালিক বেদান্ত লিমিটেড দাবি করেছে, বিস্ফোরণ ঘটেছে যে ইউনিটে, সেটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল না। বরং এটি পরিচালনা করছিল সাব-কন্ট্রাক্টর এনটিপিসি জিই পাওয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে—নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়ভার কার?
এই ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। ভারতের শিল্পখাতে বিশেষ করে ভারী যন্ত্রপাতি নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা মানদণ্ড নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন রয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নিরাপত্তা প্রটোকল উপেক্ষা এবং সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রায়ই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তদন্ত বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে এ ধরনের ঘটনার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, যেখানে প্রযুক্তিগত নজরদারি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং কঠোর নিরাপত্তা নীতিমালা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। না হলে এ ধরনের ‘দুর্ঘটনা’ বারবার ঘটতেই থাকবে, আর প্রাণ হারাবে নিরীহ শ্রমিকরা।
এই বিস্ফোরণ তাই কেবল একটি ঘটনা নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা। শিল্পোন্নয়নের দৌড়ে নিরাপত্তা যদি উপেক্ষিত হয়, তাহলে উন্নয়ন নয়, বরং বিপর্যয়ই হয়ে উঠবে বাস্তবতা।

