যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ থামানো এবং উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে নতুন দফার আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই সামনে চলে আসছে এক পুরোনো কিন্তু বিস্ফোরক প্রশ্ন—বিদেশে আটকে থাকা ইরানের বিপুল সম্পদ। সংখ্যাটা ছোট নয়। বিভিন্ন সরকারি ইরানি প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, বিদেশে ইরানের স্থগিত বা অপ্রাপ্য সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই অর্থ শুধু হিসাবের খাতা ভরিয়ে রাখে না; এটি ইরানের অর্থনীতি, কূটনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতা, এমনকি জনঅসন্তোষ—সব কিছুর সঙ্গেই সরাসরি জড়িত।
এই কারণেই বিষয়টি এখন কেবল আর্থিক প্রশ্ন নয়। এটি একসঙ্গে চাপ, দরকষাকষি, আস্থাহীনতা, রাষ্ট্রের টিকে থাকা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রশ্ন।
আলোচনার কেন্দ্রে কীভাবে এলো এই অর্থ
১০ এপ্রিল, যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা শুরুর আগে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ জানিয়েছিলেন, বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত না হলে আলোচনার ভিত্তিই দুর্বল থাকবে। পরের দিন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনার সময় কিছু প্রতিবেদন বের হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র নাকি অন্তত কিছু ইরানি সম্পদ ছাড়তে রাজি হয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন দ্রুত সেই খবর নাকচ করে দেয়।
এতে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতি নিয়ে কথা যতই চলুক, অর্থের প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস কমেনি। বরং মধ্যপ্রাচ্যের সময় অনুযায়ী ২২ এপ্রিলের প্রথম প্রহরে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই ইস্যু আবারও আলোচনার টেবিলে জোরালোভাবে ফিরে আসার সম্ভাবনাই বেশি।
এই “আটকে থাকা সম্পদ” আসলে কী
কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের অর্থ, সম্পত্তি বা আর্থিক কাগজপত্র যদি অন্য কোনো দেশ, আদালত, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অস্থায়ীভাবে ব্যবহার-অযোগ্য করে রাখে, তখন সেটিকে সম্পদ স্থগিত বা আটকে রাখা বলা হয়।
ইরানের ক্ষেত্রে এর অর্থ হচ্ছে—তারা নিজেদের উপার্জিত অর্থ, বিশেষ করে তেল বিক্রির আয়, বিদেশের ব্যাংকে জমা থাকলেও সেটি নিজেদের মতো ব্যবহার করতে পারছে না। অর্থ আছে, কিন্তু হাতে নেই। কাগজে সম্পদ, বাস্তবে অচল।
সরকারিভাবে এ ধরনের ব্যবস্থা সাধারণত নেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ, অর্থপাচার, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বা নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অভিযোগের কথা বলে। কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, এই ব্যবস্থা সব দেশের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হয় না; বরং পশ্চিমা বলয়ের বিরোধী বা অস্বস্তিকর রাষ্ট্রগুলোকেই বেশি টার্গেট করা হয়।
১০০ বিলিয়ন ডলার—সংখ্যাটি এত বড় কেন
বিশেষজ্ঞ ফ্রেডেরিক শ্নাইডার এই অর্থকে ইরানের বার্ষিক হাইড্রোকার্বন আয়ের প্রায় তিন গুণ বলে বর্ণনা করেছেন। এই তুলনাই বোঝায়, আটকে থাকা অর্থের ওজন কতটা।
একদিকে বহু দশকের নিষেধাজ্ঞায় ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি, অন্যদিকে শিল্প, জ্বালানি, অবকাঠামো ও মুদ্রাবাজারে দীর্ঘমেয়াদি চাপ—এই বাস্তবতায় ১০০ বিলিয়ন ডলার কেবল বাড়তি সহায়তা নয়, বরং ইরানের জন্য এক ধরনের আর্থিক শ্বাসনালী।
তবে এখানে একটি জটিলতা আছে। অর্থ ছাড়া হলেও ইরান সেটি পুরোপুরি স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন খোলা। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে শর্ত জুড়ে দিতে পারে—কোথায় খরচ হবে, কী উদ্দেশ্যে হবে, কোন খাতে যাবে, তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে।
আর এ কারণেই তেহরান সন্দিহান। তাদের দৃষ্টিতে, শুধু “অর্থ মুক্ত” বলা আর “অর্থের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া”—দুটো এক কথা নয়।
সব অর্থ কি সত্যিই ব্যবহার করা যাবে
এই প্রশ্নও নতুন নয়। ২০১৬ সালে সাবেক মার্কিন অর্থমন্ত্রী জ্যাকব লিউ বলেছিলেন, সব নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও ইরান বিদেশে আটকে থাকা সব সম্পদ হাতে পাবে না। কারণ, এর একটি অংশ আগেই বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বা ঋণপরিশোধের মতো খাতে বাঁধা ছিল।
অর্থাৎ, মোট অঙ্ক যতই বড় হোক, বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য অংশ কম হতে পারে। তবু আলোচনায় ইরানের তাৎক্ষণিক দাবি পরিষ্কার—কমপক্ষে ৬ বিলিয়ন ডলার ছেড়ে দেওয়া হোক, যাতে সেটি আস্থা তৈরির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করে।
ইরানের সম্পদ আটকে যাওয়ার শুরু কোথায়
এই গল্পের গোড়া ১৯৭৯ সালে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির জন্য “অস্বাভাবিক ও অসাধারণ হুমকি” বলে উল্লেখ করেন। একই সময়ে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ৬৬ জন মার্কিন নাগরিক জিম্মি ছিলেন।
তখনকার মার্কিন অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম মিলার বলেছিলেন, সে সময় ইরানের তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬ বিলিয়ন ডলারের কম, যার মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার ছিল নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ট্রেজারি নোট আকারে। পরে ১৯৮১ সালে আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতার মাধ্যমে ইরানের একটি বড় অংশের সম্পদ মুক্ত করা হয়, আর বিনিময়ে তেহরানে তখনও আটক থাকা ৫২ জন মার্কিনিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু এখানেই বিরোধের শেষ হয়নি। বরং এরপর থেকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়, বিশেষ করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে।
পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও নতুন করে সম্পদ জব্দ
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বেসামরিক জ্বালানি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বারবার অভিযোগ তুলেছে, তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে। এর জেরেই ওয়াশিংটন ও ইউরোপের একাধিক দেশ পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞা কঠোর করে।
২০১৫ সালে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ইরান যে চুক্তিতে পৌঁছায়, সেটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সেই চুক্তির ফলে ইরান তার কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয় এবং বিনিময়ে বিদেশে থাকা বহু সম্পদের ওপর পুনরায় প্রবেশাধিকার পায়। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে একতরফাভাবে ওই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন এবং আবারও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে বিদেশে থাকা ইরানের অর্থ আবারও কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
এরপর ২০২৩ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে ৬ বিলিয়ন ডলার ইরানি তেল আয়, যা দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে ছিল, কাতারে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা দিলে দোহায় থাকা ওই অর্থও আবার ইরানের নাগালের বাইরে চলে যায়।
অর্থাৎ, অর্থ সরানো হয়েছে, কিন্তু স্বাধীনভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা ফিরে আসেনি। এটিই ইরানের ক্ষোভের কেন্দ্রে।
কোন কোন দেশে আছে ইরানের আটকে থাকা অর্থ
প্রতিটি দেশে ঠিক কত আছে, তার একক ও নির্ভুল সরকারি তালিকা নেই। তবে ইরানি সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে যেসব অঙ্ক উঠে এসেছে, সেগুলো হলো—
- চীনের কাছে আছে কমপক্ষে ২০ বিলিয়ন ডলার
- ভারতের কাছে আছে ৭ বিলিয়ন ডলার
- ইরাকের কাছে আছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার
- কাতারের কাছে আছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার
- জাপানের কাছে আছে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার
- যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ধরে রেখেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার
- লুক্সেমবার্গসহ ইউরোপীয় দেশগুলোতে আছে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার
এই তালিকা থেকে দুটো বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, অর্থ এক জায়গায় নেই; বহু দেশে ছড়িয়ে আছে। দ্বিতীয়ত, ইরানের সম্পদ-সংকট মূলত কোনো এক দেশের সঙ্গে বিরোধ নয়—এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার এক জটিল রাজনৈতিক অবরোধ।
কেন এই অর্থ এখন ইরানের জন্য এত জরুরি
ইরানের অর্থনীতি বহু বছর ধরে চাপের মধ্যে। তেল রপ্তানি সীমিত, বিদেশি বিনিয়োগ অনিশ্চিত, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন বাধাগ্রস্ত, আর জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের ওপর আস্থা কমেছে। এই অবস্থায় মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, আমদানি ব্যয় বাড়ে, মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যায়, আর সামাজিক ক্ষোভও জোরালো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ও রিয়ালের দরপতনের পটভূমিতে বড় বিক্ষোভ দেখা দেয়, যা পরে শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ জানানো বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। সেই দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদপুষ্ট “সন্ত্রাসীদের” দায়ী করেছেন, আর ট্রাম্প সাম্প্রতিক সময়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু বিক্ষোভকারীকে অস্ত্র দিয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে ১০০ বিলিয়ন ডলার কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ কমানো, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক স্থিতি রক্ষার সম্ভাব্য হাতিয়ার।
অর্থ খুলে দিলে ইরান কী করতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থ ইরানকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে।
প্রথমত, তেল বিক্রির কঠিন মুদ্রার আয় দেশে ফিরিয়ে এনে সরকার বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়াতে পারবে। এতে রিয়ালের অস্থিরতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন অবহেলিত অবকাঠামো—তেলক্ষেত্র, পানিব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড—এসব খাতে আধুনিকায়ন ও সংস্কার শুরু করা সহজ হবে। বহু শিল্পক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি পুরোনো, রক্ষণাবেক্ষণ কম, উৎপাদনশীলতা সীমিত। হাতে নগদ অর্থ এলে বিদেশি কোম্পানিকে পরিশোধ করা এবং দেশীয় শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা তুলনামূলক সহজ হবে।
তৃতীয়ত, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন দ্রুত করা যাবে। সামরিক উত্তেজনা যে ক্ষতি রেখে যায়, তা শুধু ভবন বা সড়কে সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন, বাণিজ্য, জ্বালানি, সরবরাহব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। তাই অর্থমুক্তি মানে শুধু ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া নয়; এটি পুনর্গঠনের গতি বাড়ানোর একটি বাস্তব উপায়।
চতুর্থত, সরকার ও জনগণের সম্পর্ক কিছুটা হলেও নরম হতে পারে। যখন রাষ্ট্রের হাতে নগদ সক্ষমতা থাকে, তখন সামাজিক খরচ, ভর্তুকি, মজুরি, জরুরি আমদানি এবং উন্নয়ন ব্যয় সামাল দেওয়া তুলনামূলক সহজ হয়। নিষেধাজ্ঞা-নির্ভর কালোবাজারি ও দুর্নীতির যে চক্র তৈরি হয়, তারও কিছুটা লাগাম টানা সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কেন সহজে অর্থ ছাড়বে না
কারণ এই অর্থ শুধু অর্থ নয়, এটি চাপ সৃষ্টির একটি কার্যকর কূটনৈতিক অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপকে নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছে। কাজেই অর্থ খুলে দেওয়া মানে একদিকে তেহরানকে আর্থিক শ্বাস দেওয়া, অন্যদিকে নিজের চাপের শক্তি কিছুটা কমিয়ে ফেলা।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিধা। যদি অর্থ ছেড়ে দেয়, তাহলে তা ইরানের অর্থনীতিতে স্বস্তি আনতে পারে, আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন গতিও দিতে পারে। আবার যদি কঠোর অবস্থানে থাকে, তাহলে আলোচনাও ভেঙে পড়তে পারে, আস্থা-সংকটও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বর্তমান মার্কিন অবস্থানকে অনেকেই অনির্দেশ্য বলে মনে করেন। ফলে মিত্র ও প্রতিপক্ষ—দুই পক্ষই বোঝার চেষ্টা করছে, ওয়াশিংটনের পরের পদক্ষেপ আসলে কী হবে।
এই অর্থের লড়াই আসলে কোন বড় সত্যটি প্রকাশ করে
ইরানের আটকে থাকা সম্পদ নিয়ে বর্তমান টানাপোড়েন একটি বড় বাস্তবতা সামনে আনে—আজকের বিশ্বে অর্থনীতি আর কেবল বাজারের বিষয় নয়, এটি ভূরাজনীতির সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র।
একটি রাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে আর সব সময় সৈন্য লাগেই না। তার মুদ্রা দুর্বল করা, তেল আয় আটকে দেওয়া, ব্যাংকিং প্রবেশাধিকার বন্ধ করা, বৈদেশিক সম্পদ অচল করে দেওয়া—এসবই এখন শক্তিশালী অস্ত্র। ইরানের ঘটনায় সেটি অত্যন্ত স্পষ্ট।
তবে আরেকটি প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ: এত দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা কি সত্যিই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল দিয়েছে, নাকি শুধু সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন করেছে? কারণ দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের নীতিতে চাপ সৃষ্টি হলেও একই সঙ্গে সমাজে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, মুদ্রা-অস্থিরতা ও ক্ষোভও বেড়েছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা না বুঝলে ইরানের অর্থ-প্রশ্নকে শুধু নিরাপত্তা বা পরমাণু রাজনীতির ফ্রেমে ধরা যাবে না।
সামনে কী হতে পারে
যদি আলোচনায় অগ্রগতি হয়, তাহলে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার মুক্ত করার প্রশ্নটি প্রথম পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্র অর্থ ছাড়ার বদলে নতুন শর্ত আরোপ করে, তাহলে এই ইস্যু যুদ্ধবিরতি আলোচনাকেই জটিল করে তুলতে পারে।
ইরানের জন্য অর্থমুক্তি মানে অর্থনীতির ভাঙা চাকা ঘোরানোর সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি চাপের মাত্রা বাড়ানো বা কমানোর হিসাব। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য এটি একটি সংকেত—সংঘাত কমানোর পথ কি অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করার মধ্যে, নাকি সেটি আরও কঠোর করার মধ্যে?
ইরানের বিদেশে আটকে থাকা ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদকে এক লাইনে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি একই সঙ্গে অতীতের জিম্মি-সংকটের উত্তরাধিকার, পরমাণু বিরোধের ফল, নিষেধাজ্ঞা-নীতির ধারাবাহিকতা, যুদ্ধবিরতি আলোচনার দরকষাকষি, আর বর্তমান ইরানি অর্থনীতির বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
তাই এই অর্থ শুধু ব্যাংকে জমা কিছু সংখ্যা নয়। এটি ইরানের জন্য পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার, আর বিশ্বের জন্য একটি প্রশ্ন—অর্থকে অস্ত্র বানালে শেষ পর্যন্ত কারা জেতে, আর কারা তার সবচেয়ে ভারী মূল্য দেয়?
চাইলে আমি এখন এটিকে আরও ব্লগধর্মী, আরও সংবাদপত্রসুলভ, অথবা মতামতধর্মী বিশ্লেষণ ভঙ্গিতে আরেক দফা ঘষেমেজে দিতে পারি।

