ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবার চীনের সামনে এক নতুন ধরনের সংকট তুলে ধরেছে—হিলিয়াম সংকট। গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিগুলোর একটি বলছেন বিশ্লেষকদের। বাজারে হিলিয়ামের দাম ইতিমধ্যেই দ্বিগুণ হয়েছে, আর সরবরাহ এমনভাবে কমে গেছে যে শিল্প ও চিকিৎসা—দুই ক্ষেত্রেই উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে।
প্রথম দেখায় হিলিয়ামকে অনেকে হয়তো খুব সাধারণ একটি গ্যাস মনে করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এটি এমন এক কাঁচামাল, যার ওপর আধুনিক শিল্পব্যবস্থার বহু গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভরশীল। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, উন্নত গবেষণাগার, মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, এবং চিকিৎসা খাতের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রপাতিতে হিলিয়াম অপরিহার্য। ফলে এর সরবরাহে বড় ধাক্কা মানে শুধু একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়; বরং পুরো উৎপাদনশীল অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়া।
চীনের জন্য এই সংকট আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি বিশ্বের বৃহৎ শিল্প অর্থনীতির একটি এবং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের কেন্দ্রীয় শক্তি। ইলেকট্রনিক্স, চিপ, অটোমোবাইল, ভারী শিল্প—সবখানেই চীনের উৎপাদন সক্ষমতা একটি নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল প্রবাহের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। হিলিয়ামের মতো বিশেষায়িত গ্যাসের সরবরাহ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু কয়েকটি কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের দাম, রপ্তানি সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায়ও তার প্রতিফলন দেখা যাবে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে পারে চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে। চিপ তৈরির বিভিন্ন ধাপে অতিশুদ্ধ গ্যাসের প্রয়োজন হয়, আর সেই তালিকায় হিলিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কিছু কারখানা আংশিক বা পূর্ণ উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। চীনের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি বড় সতর্কসংকেত। কারণ চিপ শুধু স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের জন্য নয়, বরং গাড়ি, শিল্পযন্ত্র, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্যও অপরিহার্য।
চিকিৎসা খাতেও পরিস্থিতি কম উদ্বেগজনক নয়। এমআরআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল ইমেজিং ব্যবস্থায় হিলিয়াম ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেটকে নিম্ন তাপমাত্রায় রাখতে। যদি সরবরাহ ঘাটতি দীর্ঘ হয়, তাহলে হাসপাতালগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়বে, যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যা হবে, এবং শেষ পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। অর্থাৎ এটি শুধু শিল্পের সংকট নয়, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ও।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর, ট্রাম্প প্রশাসন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবরোধের ঘোষণা দেয়। এর ফলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ ব্যবস্থা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। হিলিয়াম তার অন্যতম বড় উদাহরণ।
চীনের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর, কারণ বিশ্বের মোট হিলিয়াম চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ এবং চীনের ৫৪ শতাংশ সরবরাহ আসে কাতার থেকে। এই পরিসংখ্যানই বোঝায়, কাতারভিত্তিক উৎপাদন বা রপ্তানি ব্যবস্থা ব্যাহত হলে চীনের ওপর তার অভিঘাত কতটা বড় হতে পারে। চলমান যুদ্ধের প্রভাবে কাতারের হিলিয়াম উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রায় ভেঙে দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে এই সরবরাহ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে।
এখানেই মূল উদ্বেগের জায়গা। কারণ বাজারে ঘাটতি তৈরি হলে সাধারণত বিকল্প উৎসের দিকে ঝোঁকার সুযোগ থাকে। কিন্তু হিলিয়ামের ক্ষেত্রে সেই বিকল্প ততটা সহজ নয়। উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত, পরিবহন ব্যবস্থা জটিল, সংরক্ষণ ব্যয়বহুল, আর নতুন উৎস দ্রুত বাজারে আনা প্রায় অসম্ভব। ফলে এই সংকট তাৎক্ষণিকভাবে কাটিয়ে ওঠার মতো নমনীয়তা বিশ্ববাজারে নেই।
সাংহাইভিত্তিক সাপ্লাই চেইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টাইডালওয়েভ সলিউশনসের সিনিয়র পার্টনার ক্যামেরন জনসনের বক্তব্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই আরও স্পষ্ট করে। তার মতে, কাতারের সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে হিলিয়ামের সরবরাহ এমনভাবে ভেঙে পড়েছে যে ভবিষ্যতে এর নির্ভরযোগ্য উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিষয়টি কেবল অস্থায়ী চাপ নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি বাজার অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরবরাহকারীদের বর্তমান অবস্থাও একই ছবি তুলে ধরে। তারা জানিয়ে দিচ্ছে, শুধু উচ্চমূল্য দিলেই পণ্য পাওয়া যাবে—এমন পরিস্থিতি এখন আর নেই। অর্থ থাকলেও বাজারে পর্যাপ্ত হিলিয়াম নেই। অনেক সময় কোনো পণ্যের দাম বাড়ে, কিন্তু বাজারে তা পাওয়া যায়। এখানে সমস্যা হচ্ছে, দামের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি বাস্তব সরবরাহও তলানিতে নেমে গেছে।
চীনের জন্য এই সংকটকে “বিরল দুর্বলতা” বলা হচ্ছে একটি বড় কারণে। দেশটি জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা বাড়িয়ে এবং বিকল্প উৎসের ওপর জোর দিয়ে চলমান বিশ্ব তেলের সংকট অনেকটা সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তু হিলিয়ামের ক্ষেত্রে সেই ধরনের কৌশলগত সুরক্ষা তার নেই। ফলে তেলের বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকা চীনও হিলিয়ামের মতো বিশেষায়িত কাঁচামালের ঘাটতিতে বিপদে পড়ে গেছে। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনো দেশ জ্বালানিতে শক্তিশালী হলেও সব ধরনের কৌশলগত সম্পদে সমানভাবে নিরাপদ নয়।
এই পরিস্থিতি থেকে বড় একটি শিক্ষা সামনে আসে। আধুনিক অর্থনীতি শুধু তেল, গ্যাস বা বিদ্যুতের ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং অনেক “অদৃশ্য” কাঁচামালের ওপরও নির্ভরশীল। হিলিয়াম তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সাধারণ পাঠকের চোখে এটি হয়তো খুব আলোচিত বিষয় নয়, কিন্তু প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চমূল্য সংযোজনশীল উৎপাদনে এর ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। তাই হিলিয়াম সরবরাহে ধাক্কা মানে শিল্প ব্যবস্থার নীরব কিন্তু গভীর অস্থিতিশীলতা।
আগামী দিনে চীনের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। প্রথমত, সীমিত সরবরাহকে কোন খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—শিল্প, গবেষণা, নাকি চিকিৎসা খাতে। দ্বিতীয়ত, বিকল্প আন্তর্জাতিক সরবরাহ উৎস কত দ্রুত নিশ্চিত করা যায়। তৃতীয়ত, নিজস্ব কৌশলগত মজুত ও দীর্ঘমেয়াদি হিলিয়াম নিরাপত্তা নীতি কত দ্রুত গড়ে তোলা সম্ভব। যদি এই তিনটি ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না যায়, তাহলে চীনের প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া এই হিলিয়াম সংকট শুধু একটি পণ্যের বাজারসংকট নয়; এটি বিশ্বায়িত অর্থনীতির ভঙ্গুর বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। কাতারনির্ভর সরবরাহ, হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা, ব্যর্থ কূটনীতি, এবং সীমিত বিকল্প উৎস—সবকিছু মিলে চীন এখন এমন এক চাপের মুখে, যা তার শিল্প ও চিকিৎসা খাতকে একই সঙ্গে নাড়িয়ে দিতে পারে। দাম দ্বিগুণ হওয়া এখানে শুধু শিরোনাম; প্রকৃত উদ্বেগ হলো, সরবরাহ ব্যবস্থা যে পর্যায়ে নেমে গেছে, তাতে সামনে আরও বড় অর্থনৈতিক ও মানবিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

