মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর মধ্যে যুদ্ধবিরতি থাকলেও স্থায়ী সমাধান এখনো অধরা। ইসলামাবাদে টানা ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি দুই পক্ষ। বরং আলোচনার টেবিল থেকে উঠে এসে আরও স্পষ্ট হয়েছে—সংঘাতের মূল জায়গাগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনার পর স্বীকার করেছেন, কোনো সমঝোতা হয়নি। তার বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল—এই অচলাবস্থা ইরানের জন্য আরও বেশি সমস্যার কারণ হতে পারে। তবে বাস্তবতা বলছে, উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে নারাজ, ফলে চুক্তির পথ আরও জটিল হয়ে উঠছে।
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা চায়, ইরান পুরোপুরি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুক। তাদের অভিযোগ—ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে দৃশ্যমান প্রমাণ এখনো উপস্থাপন করা হয়নি। অন্যদিকে ইরান স্পষ্টভাবে বলছে, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। এই অবস্থানগত দ্বন্দ্বই আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান তাদের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলুক এবং ৪০০ কিলোগ্রামের বেশি উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করুক। কিন্তু ইরান এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে এখানে কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। ইরান চায়, তাদের ওপর আরোপিত বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়া হোক, এরপর তারা জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চায়, কোনো শর্ত ছাড়াই এই প্রণালি উন্মুক্ত রাখা হোক। ফলে এই ইস্যু শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
চতুর্থত, ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ও নিষেধাজ্ঞা। ইরান দাবি করছে, তাদের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করতে হবে এবং সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং একযোগে সব ছাড় দিতে রাজি নয়।
সবশেষে রয়েছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ইস্যু। ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই দাবি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়েই বড় প্রশ্ন রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই আলোচনা শুধু একটি চুক্তি নয়—এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে, অন্যদিকে ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত শক্তি ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ফলে এখানে আপসের জায়গা খুবই সীমিত।
এর পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মিত্রদের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং সামরিক ভারসাম্য—সবকিছু মিলিয়ে এই আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুদ্ধবিরতি থাকলেও শান্তির পথ এখনো অনেক দূর। ২২ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন কোনো অগ্রগতি না হলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও, বাস্তব অগ্রগতি কতটা হবে—তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

