হরমুজ প্রণালি আবারও প্রমাণ করে দিল, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর একটির নিয়ন্ত্রণ শুধু বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়, এটি আসলে ক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক দরকষাকষির কেন্দ্রে থাকা এক গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার দ্বিতীয় দফার আলোচনাকে ঘিরে এখন যে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এই প্রণালি। আর সেটিই পুরো সংকটের ভাষা বদলে দিচ্ছে। আগে যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক কিংবা পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সেখানে এখন হরমুজকে ঘিরে ইরানের প্রভাব নিজেই একটি আলাদা এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, যুদ্ধ চলাকালে ইরান হরমুজ প্রণালিকে কার্যত বন্ধ করে দিয়ে যে বার্তা দিয়েছে, তা শুধু সামরিক ছিল না—তা ছিল অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিকও। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজার কীভাবে অস্থির হয়ে ওঠে, সেটি ইরান বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা হয়—এই একটি তথ্যই বোঝানোর জন্য যথেষ্ট যে, এটি কোনো সাধারণ নৌপথ নয়; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির ধমনি। ফলে যেই রাষ্ট্র এই পথকে অচল করার ক্ষমতা দেখাতে পারে, সে শুধু নিজের প্রতিপক্ষকে নয়, পুরো বিশ্বকেও আলোচনার টেবিলে নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য করতে পারে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে, তা হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর ভেতরে এখন গভীর অস্বস্তি কাজ করছে। কারণ তারা দেখছে, ইসলামাবাদে পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোর বদলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের প্রভাব কীভাবে সামলানো যায়, সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, নিরাপত্তা-ঝুঁকির পুরো কাঠামো বদলে যাচ্ছে। অর্থাৎ যেসব বিষয় সরাসরি উপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে—যেমন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা প্রক্সি হামলা—সেগুলো হয়তো আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে এমন এক অর্থনৈতিক সমঝোতার জায়গা তৈরি করছে, যেখানে ইরানের প্রভাবকে পুরোপুরি ভাঙা নয়, বরং ব্যবস্থাপনা করাই মূল লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কোনো শক্তিকে দমন করা আর তাকে একটি নিয়ন্ত্রিত বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়া—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কূটনৈতিক পথ। উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের উদ্বেগও এখানেই। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান আলোচনার ধরন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার বদলে উল্টো সেটিকে আরও প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। অন্যভাবে বললে, ইরান যদি হরমুজকে একটি স্বীকৃত চাপের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের প্রতিটি বড় কূটনৈতিক সংঘাতে এই প্রণালি আবারও ব্যবহৃত হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক নৌ-চলাচল ধীরে ধীরে ক্ষমতাভিত্তিক সমীকরণে রূপ নিতে পারে।
সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভের বক্তব্যও এই বাস্তবতাকে আরও ধারালো করে তোলে। তাঁর মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কেবল হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া পর্যন্তই সীমিত থাকতে পারে, কিন্তু অঞ্চলজুড়ে সামগ্রিক উত্তেজনা কমানো হয়তো অধরাই থেকে যাবে। এই পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে বর্তমান আলোচনার প্রকৃতি কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তির মতো নয়; বরং এটি সংকট-পরিচালনার কূটনীতি। অর্থাৎ লক্ষ্য হচ্ছে পরিস্থিতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যাতে বিশ্ববাজার ভেঙে না পড়ে, কিন্তু মূল দ্বন্দ্বের শিকড় অক্ষত থাকে।
মেদভেদেভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের যুদ্ধবিরতি কীভাবে কার্যকর হবে তা স্পষ্ট নয়, তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ইরান তার পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করেছে, আর তার নাম হরমুজ প্রণালি। বক্তব্যটি রাজনৈতিক অলংকার হলেও, এর ভেতরে একটি জোরালো কৌশলগত সত্য আছে। ইরান হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেনি, কিন্তু হরমুজকে এমন এক প্রতিরোধক্ষম অস্ত্রে পরিণত করেছে যার প্রভাব অর্থনৈতিকভাবে পারমাণবিক চাপের সমতুল্য। কারণ বিশ্বশক্তিগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো তাদের জ্বালানি নির্ভরতা এবং বাজার-সংবেদনশীলতা। ইরান সেই জায়গাতেই আঘাত করেছে।
সরকারি মহলের ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় সূত্রের মন্তব্য—“দিনশেষে হরমুজই হবে রেড লাইন”—এই সংকটের সারমর্মকে আরও পরিষ্কার করে। আগে যে ইস্যু ছিল না, এখন সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর সীমারেখা। অর্থাৎ ভবিষ্যতে পারমাণবিক কার্যক্রমের কোনো নির্দিষ্ট সীমা, ক্ষেপণাস্ত্রের কোনো প্রযুক্তিগত পরিমাপ বা প্রক্সি কার্যক্রমের কোনো আঞ্চলিক বিস্তার নয়—বরং হরমুজে নৌ-চলাচল, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি প্রবাহ এবং সেই প্রবাহের ওপর ইরানের বাস্তব নিয়ন্ত্রণই হবে উত্তেজনার প্রধান মাপকাঠি।
ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালিকে “গোল্ডেন অ্যাসেট” বলে যে বর্ণনা দিয়েছেন, সেটি নিছক রাজনৈতিক ভাষা নয়; বরং বহু বছরের পরিকল্পিত সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রস্তুতির প্রতিফলন। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান বছরের পর বছর ধরে হরমুজ বন্ধ করার পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে এবং প্রতিটি পদক্ষেপ পরিকল্পনা করেছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়, হরমুজ কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার অস্ত্র নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধনীতির কেন্দ্রীয় উপাদান। অর্থাৎ ইরান একে কেবল সংকটের মুহূর্তে ব্যবহারযোগ্য “আপদকালীন ব্যবস্থা” হিসেবে দেখে না; বরং এটি তাদের কৌশলগত নিরাপত্তা মতবাদের অংশ।
এখানেই মূল বিশ্লেষণটি জরুরি হয়ে ওঠে। প্রশ্নটি এখন আর কেবল এই নয় যে হরমুজ প্রণালি কার নিয়ন্ত্রণে। আসল প্রশ্ন হলো, এই প্রণালি দিয়ে চলাচলের নিয়ম কে ঠিক করবে। যদি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন ও বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামোর বদলে একটি আঞ্চলিক শক্তি নিজের সামরিক সক্ষমতা দেখিয়ে কার্যত নিয়ম নির্ধারণের অবস্থানে চলে আসে, তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য বড় এক ধাক্কা। উপসাগরীয় সূত্রগুলো বলছে, বিরোধের কেন্দ্র এখন নিয়ন্ত্রণের মালিকানা নয়, বরং নৌ-চলাচলের আচরণবিধি নির্ধারণের ক্ষমতা। এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়মভিত্তিক কাঠামো থেকে শক্তিভিত্তিক বাস্তবতায় ঠেলে দেয়।
উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর ভয় আরও অন্য জায়গাতেও। তাদের মতে, ইসরায়েল ও বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার। কিন্তু আলোচনায় যদি কেবল হরমুজের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাবই মুখ্য হয়ে ওঠে, তাহলে তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তাজনিত মূল উদ্বেগগুলো অমীমাংসিত থেকে যাবে। আরব আমিরাতের এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ইবতেসাম আল-কেতাবির মন্তব্য তাই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, যা তৈরি হচ্ছে তা কোনো ঐতিহাসিক মীমাংসা নয়, বরং টেকসই সংঘাতের একটি পরিকল্পিত কৌশল। এই মন্তব্যের ভেতরে স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে—আলোচনার লক্ষ্য শান্তি নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা।
তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সিদের কারণে কারা সবচেয়ে বেশি ভুগছে? তাঁর উত্তর—ইসরায়েল এবং বিশেষ করে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো। তাঁদের জন্য ভালো চুক্তি হতো এমনটি, যা ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি এবং হরমুজ—তিনটি ইস্যুকেই একসঙ্গে মোকাবিলা করত। কিন্তু তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রক্সি নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন নয়। এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার তালিকা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা-দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি ফাঁক তৈরি হয়েছে। আর এই ফাঁকই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের যে প্রভাব পড়েছে, তা কেবল সামরিক সীমার মধ্যে আটকে নেই। জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা, রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিমা খরচ বেড়ে যাওয়া, বিকল্প বাণিজ্যপথের অতিরিক্ত খরচ—সব মিলিয়ে উপসাগরীয় অর্থনীতি ইতোমধ্যে বড় চাপের মধ্যে পড়েছে। তার ওপর যে বিকল্প পথগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির বাইরে নয়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্র আর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—দুটি আলাদা জগৎ নয়; তারা এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। এই পরিস্থিতিতে হরমুজকে শুধু সামরিক নয়, আর্থিক অস্ত্র হিসেবেও দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে।
পুরো আরব উপসাগরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুভূতিতে যে চাপা ক্ষোভ, হতাশা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, সেটিও ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটির নিরাপত্তা কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নির্ভরতার জায়গা হিসেবে দেখা হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ মিত্রদের উদ্বেগকে উপেক্ষা করতে পারে। সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগেরের মন্তব্য এখানে গভীর তাৎপর্য বহন করে। তাঁর মতে, ইরান ইস্যু মোকাবিলায় ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, আর যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও তার মানে এই নয় যে অঞ্চলকে বাইরে রেখে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এই মন্তব্য আসলে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর দীর্ঘদিনের নীরব ক্ষোভকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
এই কারণেই উপসাগরীয় কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনকে ঢালাওভাবে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং ইরানের আচরণ যাচাইয়ের জন্য ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এটি একটি বাস্তববাদী অবস্থান। কারণ অঞ্চলটির দেশগুলো বুঝতে পারছে, কোনো তাড়াহুড়োর সমঝোতা সাময়িক বাজারস্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে ইরানকে নতুন কৌশলগত স্বীকৃতিও দিতে পারে। আর সেটি হলে পরবর্তী সংকটে দাম চুকাতে হবে মূলত তারাই।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিক্ষাবিদ আবদুলখালেক আবদুল্লাহর বক্তব্যও পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ সামনে আনে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রও ভুল করতে পারে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, হরমুজ নিয়ে সংঘাতের সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখেছিল ওয়াশিংটন। যুদ্ধ চলার সময় যুক্তরাষ্ট্র যদিও বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, নৌ-নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছে, তবু এই আশ্বাস আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটাতে পারেনি। কারণ বাস্তবে উপসাগরীয় দেশগুলো দেখেছে, তাদের সতর্কতা আগেভাগে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
দুবাইভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র বিহুথের পরিচালক মোহাম্মদ বাহারুনের পর্যবেক্ষণ সম্ভবত এই পুরো সংকটের সবচেয়ে গভীর সারাংশ। তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধের একটি বড় শিক্ষা হলো কোনো একক বহিঃশক্তির ওপর নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা। উপসাগরীয় আরবরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে আসলেও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা নীরব। এই নীরবতা আসলে অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বহন করলেও যুদ্ধের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। এ যেন এমন এক বাস্তবতা, যেখানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি বহন করছে যারা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে তাদের ভূমিকাই সবচেয়ে সীমিত।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, দ্বিতীয় দফা আলোচনায় হয়তো উত্তেজনা পুরোপুরি দূর হবে না, তবে সেটিকে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনার চেষ্টা হবে। এই ফলাফল ওয়াশিংটন ও তেহরানের জন্য ব্যবহারিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কারণ এতে উভয় পক্ষই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান কিছুটা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এতে অস্থিতিশীলতা স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। কারণ ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি, প্রক্সি তৎপরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা-সঙ্কট যদি অমীমাংসিত থাকে, তাহলে হরমুজ খুলে গেলেও অস্থিরতার মূল কারণ দূর হবে না।
শেষ পর্যন্ত এই সংকট আমাদের সামনে একটি বড় সত্য তুলে ধরে—আধুনিক ভূরাজনীতিতে শক্তি কেবল অস্ত্রভাণ্ডারে থাকে না, থাকে মানচিত্রের সরু জলপথেও। হরমুজ প্রণালি এখন আর শুধু তেল পরিবহনের পথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক ভয়, নিরাপত্তা-দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতীক। ইরান এই প্রতীককে বাস্তব অস্ত্রে রূপ দিয়েছে, আর সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা এখন আর শুধু পারমাণবিক চুক্তি বা সামরিক উত্তেজনার গল্প নয়—এটি মূলত সেই প্রশ্নের গল্প, কে বৈশ্বিক শিরায় চাপ দিতে পারে, আর কে সেই চাপ সহ্য করতে বাধ্য হয়।

