পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বহুল আলোচিত প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, যা রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোটপর্বে এক হাজার ৪৫২ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে ভোট দিচ্ছেন প্রায় তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষ।
এই দফায় উত্তরবঙ্গের আটটি জেলা এবং দক্ষিণবঙ্গের আটটি জেলা মিলিয়ে মোট ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ চলছে। সংখ্যার হিসেবে এটি শুধু একটি সাধারণ নির্বাচন নয়, বরং এটি ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে এমন এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই।
নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা ও উদ্বেগ—দুটোই সমানভাবে কাজ করছে। ভোটার তালিকায় প্রায় ১২ শতাংশ কাটছাঁটের পর শুরু হওয়া এই নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে নজিরবিহীন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোতায়েন করা হয়েছে রেকর্ডসংখ্যক দুই হাজার ৪৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনী, যাদের অধীনে রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ সদস্য। এই বিশাল নিরাপত্তা বলয় প্রমাণ করে, নির্বাচন কমিশন কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম দফার এই ভোট মূলত উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই ১৫২টি আসনের মধ্যে ৫৯টি পেয়েছিল বিজেপি, আর ৯৩টি ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে। সেই হিসাব অনুযায়ী, এবারের ভোটে উত্তরবঙ্গ হয়ে উঠেছে ‘গেম চেঞ্জার’ অঞ্চল।
একদিকে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল রাজ্যে নিজেদের জায়গা শক্ত করতে আগ্রাসী প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্য নিয়ে লড়ছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। রাজনীতির এই দ্বিমুখী সংঘর্ষ এখন একপ্রকার মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
আগামী ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ, যেখানে কলকাতা ও আশপাশের এলাকার ১৪২টি আসনে ভোট হবে। আর পুরো নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হবে ৪ মে—যেদিন স্পষ্ট হবে বাংলার আগামী রাজনৈতিক মানচিত্র।
এই নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এই অঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা মানেই ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণে এগিয়ে থাকা। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকা ও চা-বাগান অঞ্চলের ভোটের প্রবণতা কোন দিকে যায়, তা নিয়েও রয়েছে বাড়তি কৌতূহল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তত ৮০টি আসনে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে সরাসরি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। আবার কিছু আসনে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ফলাফল অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে, যা পুরো নির্বাচনকে আরও জটিল ও নাটকীয় করে তুলেছে।
ভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক বক্তব্যও কম নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই নির্বাচনকে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ হিসেবে বর্ণনা করে নারী ও তরুণ ভোটারদের বেশি করে ভোট দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচনের আগের দিন উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙ্গায় এক সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, ভয় দেখিয়ে তার দলকে সরানো যাবে না এবং বাংলার মানুষ এখনো তাদের সঙ্গেই আছে।
তৃণমূল কংগ্রেস ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, এই ভোটই তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের জবাব দেওয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বিপরীতে বিরোধী শিবির থেকে দাবি করা হয়েছে, ভোটার তালিকা যদি স্বচ্ছ থাকে, তাহলে ক্ষমতাসীনদের জয়ের সম্ভাবনা কমে যাবে।
সব মিলিয়ে প্রথম দফার এই ভোট শুধু আসনসংখ্যার হিসাব নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা—যেখানে বোঝা যাবে বাংলার মানুষ কোন দিকে ঝুঁকছে। উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু হওয়া এই ভোটযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল ঘটাবে, নাকি পুরোনো ধারাই বজায় থাকবে—তার উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে।
একই দিনে তামিলনাড়ুতেও বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। সেখানে চার হাজার ২৩ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে ভোট দিচ্ছেন পাঁচ কোটি ৭৩ লাখের বেশি মানুষ।
এই রাজ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোট এবং এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। একদিকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই করছেন, অন্যদিকে পাঁচ বছর পর আবারও ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছেন ইদাপ্পাদি কে পালানিস্বামী।
এই নির্বাচনের প্রথম ধাপই বলে দিচ্ছে—ভারতের রাজ্য রাজনীতিতে এখন প্রতিযোগিতা কতটা তীব্র এবং কৌশলনির্ভর হয়ে উঠেছে। শুধু সংখ্যা নয়, অঞ্চলভিত্তিক প্রভাব, ভোটার আচরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এখন নির্বাচনের বড় ফ্যাক্টর।
বাংলার ভোট এবার শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এটি একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা—যার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে পারে।

