মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন শুধু আকাশ হামলা, সামরিক ঘাঁটি বা কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে আটকে নেই। এর সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ এখন সমুদ্রপথে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে। এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় একটি অংশ চলাচল করে। তাই এখানে উত্তেজনা তৈরি মানেই শুধু ইরান বা আমেরিকার সংকট নয়; এর ঢেউ লাগে বিশ্ববাজারে, জ্বালানি দামে, বাণিজ্যে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
২৪ এপ্রিল ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান “আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে”। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধের কারণে ইরান প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন, ইরানের সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বেতন না পাওয়ার অভিযোগ করছে।
তবে বাস্তবতা এত সরল নয়। ইরান অবশ্যই চাপের মুখে আছে, কিন্তু দেশটি একেবারে অচল হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই কঠিন। কারণ তেলের দাম বেড়েছে, সমুদ্রে ইরানের বড় পরিমাণ তেল রয়েছে, চীনের মতো ক্রেতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, আর হরমুজ প্রণালীকেও তেহরান পাল্টা চাপের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
অবরোধের শুরু এবং ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ শুরু করে ১৩ এপ্রিল, ১৪:০০ গ্রিনিচ মান সময় থেকে। এরপর ইরানি পতাকাবাহী ট্যাংকারে গুলি চালানো, জাহাজ আটক করা এবং ইরানের উদ্দেশে বা ইরান থেকে পণ্যবাহী জাহাজের পথ পরিবর্তনে বাধ্য করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
তেহরান এই পদক্ষেপকে অবৈধ বলে উল্লেখ করেছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী একে জলদস্যুতার সঙ্গে তুলনা করেছে। তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ আটকানো কোনো বৈধ নিরাপত্তা পদক্ষেপ নয়, বরং এটি সরাসরি অর্থনৈতিক যুদ্ধের অংশ।
ইরানও পাল্টা চুপ করে বসে থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী বিদেশি জাহাজের জন্য বন্ধ করে দেয় এবং কয়েকটি বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ আটক করে। আগে তেহরান কিছু “বন্ধুসুলভ” জাহাজকে পার হওয়ার সুযোগ দিত, কিন্তু সংকট বাড়ার পর সেই ছাড়ও সীমিত হয়ে যায়।
১৯ এপ্রিল ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে না। তাঁর বক্তব্যের মূল অর্থ ছিল—ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে, অথচ অন্যরা নিরাপদে একই সমুদ্রপথ ব্যবহার করবে—এমন সমীকরণ তেহরান মানবে না।
ইরানের অর্থনীতিতে আঘাত কতটা গভীর?
ইরান সমুদ্রপথে তেল, গ্যাস, পেট্রোরসায়ন পণ্য, প্লাস্টিক এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। তাই বন্দর অবরোধ দেশটির অর্থনীতির ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
তবে এখানে একটি বড় জটিলতা আছে। যুদ্ধ শুরুর পর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালী কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শান্তিকালীন সময়ে এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ যেত। প্রণালী প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
এই দাম বৃদ্ধির কারণে ইরানও কিছুটা আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, ইরান মার্চে দৈনিক ১.৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। এপ্রিলের এ পর্যন্ত রপ্তানি দাঁড়িয়েছে দৈনিক ১.৭১ মিলিয়ন ব্যারেল। তুলনায় ২০২৫ সালে গড় রপ্তানি ছিল দৈনিক ১.৬৮ মিলিয়ন ব্যারেল।
অর্থাৎ যুদ্ধ, অবরোধ ও উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও ইরানের তেল রপ্তানি পুরোপুরি থেমে যায়নি।
১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইরান ৫৫.২২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। গত এক মাসে ইরানের তিন প্রধান ধরনের তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নামেনি; অনেক দিন তা ১০০ ডলারেরও বেশি ছিল। যদি সতর্ক হিসাবেও ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ধরা হয়, তাহলে ওই সময়ের তেল রপ্তানি থেকে ইরানের আয় অন্তত ৪.৯৭ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে যুদ্ধ শুরুর আগে, ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইরান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি থেকে দিনে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার আয় করছিল। মাসে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার। এই তুলনায় দেখা যায়, যুদ্ধের পর গত এক মাসে ইরানের তেল আয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হয়েছে।
এখানেই ট্রাম্পের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এটি সত্য। কিন্তু একই সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশটি অতিরিক্ত আয়ও করেছে। ফলে “ইরান প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ডলার হারাচ্ছে”—এই দাবি পুরো অর্থনৈতিক ছবিকে এক বাক্যে ব্যাখ্যা করে না।
যুক্তরাষ্ট্রের আসল লক্ষ্য কী?
ওয়াশিংটনের বড় লক্ষ্য হলো ইরানের নগদ প্রবাহ বন্ধ করা। ইরানের তেল আয়ের ওপর চাপ তৈরি করা গেলে তেহরানের সামরিক ব্যয়, আঞ্চলিক প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি—সব জায়গায় চাপ বাড়বে। তাই নৌ অবরোধ শুধু সামুদ্রিক অভিযান নয়; এটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল।
কিন্তু সমস্যা হলো, অবরোধ শুরু করলেই সব আয় সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় না। কারণ ইরানের অনেক তেল ইতিমধ্যেই সমুদ্রে আছে। অনেক তেল ট্যাংকারে বোঝাই অবস্থায় বিভিন্ন গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। কিছু তেল ভাসমান মজুত হিসেবেও রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ভাসমান ট্যাংকারে তেলের মজুত প্রায় ১২৭ মিলিয়ন ব্যারেল ছিল। এই মজুত ইরানকে কিছু সময়ের জন্য চাপ সামলানোর সুযোগ দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে অবরোধের প্রভাব নেই। বরং অবরোধ যত দীর্ঘ হবে, নতুন রপ্তানি, জাহাজ চলাচল এবং মজুত ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তত বাড়বে।
আমেরিকা নিজেই কতদিন এই অবরোধ চালাতে পারবে?
প্রশ্ন শুধু ইরান কতদিন টিকবে তা নয়; প্রশ্ন হলো আমেরিকাও কতদিন এই চাপ ধরে রাখতে পারবে।
১ মে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হয়ে উঠতে পারে। কারণ কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশে আক্রমণাত্মক সামরিক পদক্ষেপ চালানোর ৬০ দিনের সীমা তখন শেষ হওয়ার কথা। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন আইনগত ও রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তার ওপর চীনের বিষয়টি আছে। চীন ইতিমধ্যে জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চীনা বাণিজ্যে বাধা গ্রহণযোগ্য নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র এমন জাহাজ আটকায় যেগুলো চীনের পণ্য বা চীনা স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত, তাহলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
আরেকটি বড় চাপ আসতে পারে তেলের বাজার থেকে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে বা অস্থির থাকলে জ্বালানির দাম বাড়বে। এতে আমেরিকার মিত্র দেশগুলো যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি মার্কিন ভোক্তারাও চাপ অনুভব করবে। জ্বালানির দাম বাড়লে তা দ্রুত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় হয়ে যায়।
এই কারণেই ইরানের কৌশল হতে পারে সময় টেনে নেওয়া। তেহরান হয়তো মনে করছে, তারা কিছু সময় চাপ সহ্য করতে পারলে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, মিত্রদের অস্বস্তি এবং চীনের প্রতিক্রিয়া ওয়াশিংটনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করবে।
ইরানের তেল মজুত কতটা ভরসা দিচ্ছে?
ইরানের অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলোর দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ব্যারেল। দেশটির তেল উৎপাদন মূলত খুজেস্তান অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। গ্যাস ও ঘনীভূত জ্বালানি আসে দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত বুশেহর অঞ্চল থেকে।
ইরান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থার তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী। দেশটি তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ খার্গ দ্বীপ দিয়ে রপ্তানি করে, যা শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে সমুদ্রপথে যায়।
নৌ অবরোধের কারণে ইরানকে আরও বেশি তেল জমিয়ে রাখতে হতে পারে। কিন্তু মজুতের জায়গা সীমাহীন নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের স্থলভাগে এখনো কিছু মজুত সক্ষমতা আছে, যা বর্তমান উৎপাদনের প্রায় ২০ দিনের সমান। তাই তাৎক্ষণিক উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও মে মাসের দিকে চাপ বাড়তে পারে।
খার্গ দ্বীপে ইরান নাশা নামে ৩০ বছর বয়সী একটি পুরোনো বড় তেলবাহী জাহাজ আবার ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি তেল সংরক্ষণের কাজে লাগানো হতে পারে। এর অর্থ, তেহরান বুঝতে পারছে যে মজুত সংকট সামনে বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
সমুদ্রে থাকা তেল: ইরানের বড় বাফার
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসাগুলোর একটি হলো সমুদ্রে থাকা তেল। এক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের পর ইরান নতুন তেল রপ্তানিতে বাধার মুখে পড়লেও, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জাহাজে থাকা ইরানি তেলের পরিমাণ ১৬০ মিলিয়ন থেকে ১৭০ মিলিয়ন ব্যারেলের মধ্যে হতে পারে। এই মজুত থেকে ইরান আগস্ট পর্যন্ত রাজস্বপ্রবাহ ধরে রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরেক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে পানিতে থাকা ইরানি অপরিশোধিত তেলের পরিমাণ প্রায় ১৮৩ মিলিয়ন ব্যারেল। এর মধ্যে প্রায় ১৪.৭ মিলিয়ন ব্যারেল মধ্যপ্রাচ্য উপসাগর এলাকায়, ১১.৯ মিলিয়ন ব্যারেল ওমান উপসাগরে, ৯ মিলিয়ন ব্যারেল আরব সাগরে এবং ৬.৫ মিলিয়ন ব্যারেল মধ্য ভারত মহাসাগরে রয়েছে। বাকি তেল মালাক্কা প্রণালী, দক্ষিণ চীন সাগর এবং চীনের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান করছে।
এই তথ্যগুলো দেখায়, ইরানের তেল নেটওয়ার্ক শুধু একটি বন্দর বা একটি পথের ওপর নির্ভরশীল নয়। তবে ঝুঁকিও কম নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রে থাকা ট্যাংকারও আটকাতে থাকে, তাহলে ইরানের আয়প্রবাহ আরও চাপে পড়বে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র এশীয় জলসীমায় অন্তত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী ট্যাংকার আটকায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এগুলো ভারত, মালয়েশিয়া এবং শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি ছিল।
চীনের ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
চীন ইরানি তেলের বড় ক্রেতা। তাই ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করছে চীনের অবস্থানের ওপর। যদি চীন ইরানি তেল কেনা চালিয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন হবে।
তবে চীনও সরাসরি সংঘাতে যেতে চাইবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র যদি বেছে বেছে ইরানি তেলবাহী জাহাজ আটকায়, তাহলে তা ইরান ও চীনের ওপর চাপ বাড়াবে। কিন্তু ওয়াশিংটন যদি খুব বেশি আগ্রাসী হয়, তাহলে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা এমন পর্যায়ে যেতে পারে যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও অস্বস্তিকর হবে।
তাই সম্ভাবনা হলো, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো পুরোপুরি সর্বাত্মক আটক নীতি নেবে না; বরং বেছে বেছে জাহাজ আটকিয়ে চাপ বজায় রাখবে। এতে একদিকে ইরানকে বার্তা দেওয়া যাবে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সরাসরি বড় সংঘাতও এড়ানোর চেষ্টা করা যাবে।
হরমুজ প্রণালীতে টোল: ইরানের নতুন চাপের কৌশল
তেল ছাড়াও ইরান আরেকটি আয়ের পথ তৈরি করেছে বলে জানা যাচ্ছে। মার্চ থেকে তেহরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী কিছু জাহাজের কাছ থেকে পারাপার ফি নিচ্ছে। ইরানের ডেপুটি পার্লামেন্ট স্পিকার হামিদরেজা হাজি-বাবাই বলেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর আরোপিত এই ফি থেকে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথম আয় পেয়েছে। তবে কত অর্থ এসেছে, তা পরিষ্কার নয়।
ইরানি রাজনীতিক আলায়েদ্দিন বোরুজেরদি মার্চে বলেন, কিছু জাহাজের কাছ থেকে ইরান ২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নিয়েছে। কিছু জাহাজ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে অর্থ দিয়েছে বলেও উল্লেখ আছে।
এই ব্যবস্থার অর্থনৈতিক মূল্য হয়তো তেলের আয়ের তুলনায় কম। কিন্তু এর রাজনৈতিক বার্তা বড়। ইরান বলতে চাইছে, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা, চলাচল ও খরচ—সবকিছুতে তার প্রভাব আছে। কেউ যদি ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ দেয়, তাহলে তেহরানও বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্যপথে চাপ তৈরি করতে পারে।
ইরানের নেতৃত্ব কি সত্যিই দুর্বল হচ্ছে?
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি আছে এবং তথাকথিত মধ্যপন্থী ও কঠোরপন্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। কিন্তু ইরানি কর্মকর্তারা এর বিপরীত দাবি করছেন। তাঁদের বক্তব্য, সংকটের সময়ে ইরানের সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেছেন, রাজনৈতিক বৈচিত্র্য থাকলেও বিপদের সময়ে ইরান এক পতাকার নিচে এক হয়ে যায়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ইসরায়েলের হত্যাকাণ্ড ও হামলার পরও ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ঐক্য, উদ্দেশ্য ও শৃঙ্খলা নিয়ে কাজ করছে।
প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান আরও সরাসরি বলেছেন, ইরানে এখন আলাদা করে মধ্যপন্থী বা কঠোরপন্থী নেই; সবাই ইরানি এবং বিপ্লবী। তাঁর ভাষায়, জাতি ও রাষ্ট্রের ঐক্য আক্রমণকারীকে অনুতপ্ত করবে।
এই বক্তব্যগুলোকে নিছক সরকারি প্রচার বলেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ বাইরের আক্রমণ অনেক সময় দেশের ভেতরের বিভাজনকে সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ এক জায়গায় দাঁড়াতে বাধ্য হয়। ইরানের ক্ষেত্রেও সেটি ঘটতে পারে।
সামরিক দিক থেকে ইরানের শক্তি কোথায়?
ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং দেশটি অসম যুদ্ধকৌশলে দক্ষ। এর মধ্যে আছে গেরিলা কৌশল, সাইবার হামলা, আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীকে সহায়তা, জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি করা।
যুদ্ধের সময়ে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে হুমকি দেওয়া হয়েছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তথ্যকেন্দ্রও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা এবং সেখানে মাইন বসানোর অভিযোগও জ্বালানি বাজারে আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
ইরানের কৌশল সম্ভবত সরাসরি আমেরিকাকে হারানো নয়। বরং লক্ষ্য হলো যুদ্ধ ও অবরোধের খরচ এত বাড়িয়ে দেওয়া, যেন ওয়াশিংটন নিজেই হিসাব পাল্টাতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ ইরান সামরিক শক্তির পাশাপাশি সময়, ভূগোল এবং জ্বালানি বাজারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
ইরান কতদিন টিকতে পারে?
সব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে বলা যায়, ইরান তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়ার অবস্থায় নেই। অবরোধ দেশটির অর্থনীতিকে চাপ দিচ্ছে, কিন্তু ইরানের হাতে কিছু বাফার আছে।
প্রথমত, গত এক মাসে তেলের উচ্চ দামের কারণে ইরানের আয় যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রে থাকা ১৬০ মিলিয়ন থেকে ১৭০ মিলিয়ন ব্যারেল বা অন্য হিসাবে প্রায় ১৮৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল কিছু সময়ের জন্য রাজস্বপ্রবাহ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। তৃতীয়ত, চীনের মতো ক্রেতা থাকলে ইরানের তেল পুরোপুরি বাজারহীন হয়ে যাবে না। চতুর্থত, হরমুজ প্রণালীতে পারাপার ফি তেহরানকে সীমিত হলেও অতিরিক্ত আয় এবং রাজনৈতিক চাপের সুযোগ দিচ্ছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা বাড়বে। স্থলভাগের মজুত সক্ষমতা প্রায় ২০ দিনের বর্তমান উৎপাদনের সমান। নতুন রপ্তানি কমে গেলে উৎপাদন কমাতে হবে। জাহাজ আটক বাড়লে ক্রেতারা ঝুঁকি নিতে চাইবে না। আর তেল বিক্রি হলেও অর্থ আদায় ও নিরাপদে লেনদেন করা কঠিন হতে পারে।
তাই ইরান কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস চাপ সামলাতে পারে, কিন্তু অনির্দিষ্টকাল একইভাবে চলা কঠিন।
আমেরিকার জন্যও ঝুঁকি কম নয়
আমেরিকা সামরিকভাবে শক্তিশালী, কিন্তু অবরোধ চালানো সহজ কাজ নয়। এতে নৌবাহিনীর ওপর চাপ বাড়ে, আইনগত প্রশ্ন ওঠে, মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় দরকার হয় এবং তেলের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়ে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। জ্বালানির দাম বাড়লে ভোটাররা সরাসরি প্রভাব অনুভব করে। আবার দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে কংগ্রেস, সংবাদমাধ্যম এবং জনমতের চাপ বাড়তে পারে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যাডাম এরেলির মতে, ইরান কঠিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে থাকার প্রস্তুতি রাখে। তাঁর ধারণা, ইরানের সহনশীলতা অনেক মার্কিন নীতিনির্ধারকের অনুমানের চেয়ে বেশি হতে পারে।
বিশ্লেষণ: হরমুজ এখন শুধু জলপথ নয়, ক্ষমতার পরীক্ষা
হরমুজ প্রণালী এখন শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি ভূরাজনীতির বড় চাপের অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের অর্থনীতি চেপে ধরতে। ইরান পাল্টা দেখাচ্ছে, তাকে চাপে ফেললে বৈশ্বিক তেল সরবরাহও নিরাপদ থাকবে না।
এই সংকটের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো: কে বেশি সময় ধরে চাপ সহ্য করতে পারবে?
ইরানের হাতে আছে ভৌগোলিক সুবিধা, সমুদ্রে থাকা তেল, চীনের সম্ভাব্য ক্রয় এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বার্তা। আমেরিকার হাতে আছে সামরিক শক্তি, জাহাজ আটকানোর সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির ক্ষমতা। কিন্তু ওয়াশিংটনের সীমাবদ্ধতাও আছে—আইনগত সময়সীমা, জনমত, তেলের দাম, মিত্রদের অস্বস্তি এবং চীনের প্রতিক্রিয়া।
এ কারণে এই লড়াই শুধু অর্থনৈতিক নয়, শুধু সামরিকও নয়। এটি ধৈর্য, সময়, জ্বালানি বাজার এবং রাজনৈতিক হিসাবের লড়াই।
ইরান চাপে আছে—এটা স্পষ্ট। কিন্তু ইরান একেবারে ভেঙে পড়ছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যায় না। দেশটির তেল আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, সমুদ্রে বড় মজুত আছে, চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, আর হরমুজ প্রণালীকে তেহরান পাল্টা চাপের হাতিয়ার বানিয়েছে।
অন্যদিকে আমেরিকাও পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। অবরোধ দীর্ঘ হলে তেলের দাম, মিত্রদের চাপ, কংগ্রেসের প্রশ্ন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
তাই এই সংকটের আসল উত্তর এখনো সময়ের হাতে। ইরান কতদিন টিকবে, তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমেরিকা কতদিন এই অবরোধ ধরে রাখতে পারবে। হরমুজের এই টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে সেই পক্ষ, যে বেশি সময় ধরে চাপ সহ্য করতে পারবে এবং প্রতিপক্ষের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারবে।

